বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ‘নতুন বাংলাদেশের’ অভ্যুদয়ের পর সারাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদত্যাগের হিড়িক পড়ে গেছে। এই পদত্যাগ মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কয়েকজন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে, যারা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তারা আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেহেতু শিক্ষকদের নিপীড়ন করা হয়েছে, তাই এখনও হবে—এমন যুক্তিও দিচ্ছেন অনেকে। অনেকের অভিমত, আওয়ামী লীগ আমলে যারা নির্যাতন করেছে তাদের উপর প্রতিশোধ রোধ করা সম্ভব নয়। কেউ কেউ বলছেন, কোনো কোনো শিক্ষক তাদের মন্দ আচরণের প্রতিফল পাচ্ছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে রাজনীতির নোংরা খেলাও ছিল। শিক্ষক বিতাড়নের রাজনীতির নোংরা খেলায় অনেক শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন। শিক্ষা উপদেষ্টা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতৃত্ব শিক্ষক নিপীড়ন গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কগণ শিক্ষক নিপীড়ন বন্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের বাইরে থেকে প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে, তারা না বুঝে প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে শিক্ষকদের বিতাড়নে অংশ নিয়েছে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা যখনই বুঝতে পেরেছে তখনই তারা তাদের বিতাড়িত শিক্ষককে আবার ফেরত এনেছে, শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। শিক্ষক বিতাড়নে স্কুলের শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও কাজ করেছে। অনেকে আবার ‘বেত’ উঠিয়ে দেওয়াকে দায়ী করেছেন। কিন্তু শাস্তি দিয়ে ‘মানুষ’ করা গেলে তৃতীয় বিশ্বের লোকগুলোর জন্য জেলখানা লাগত না। শাস্তি দিয়ে পড়ালেখা বা নৈতিকতা শেখানোর কথা পশ্চিমের দেশগুলোতে কল্পনাও করা যায় না। উন্নত দেশগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর শারীরিক বা মানসিক কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয় না; অথচ জাপান, সুইডেন প্রভৃতি দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা অসম্ভব অমায়িক, ভদ্র ও বিনয়ী।

আমি বাংলাদেশ ব্যাংক, ফরিদাবাদ স্কুলে সাত বছর ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলাম; বাংলাদেশ ব্যাংক, মতিঝিল স্কুলে দুই টার্ম ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ছিলাম এবং টাকশাল স্কুলের পৃষ্ঠপোষক ছিলাম দশ বছর। প্রতিটি স্কুলে ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে এবং সাবজেক্ট ও ক্লাস বরাদ্দ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে রেষারেষি দেখেছি। সাধারণত সহকারী প্রধান শিক্ষকের সাথে প্রধান শিক্ষকের সম্পর্ক থাকে সাপে-নেউলে, প্রধান শিক্ষককে সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হওয়ার তীব্র বাসনা লক্ষ্য করেছি সহকারী প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে। যে সকল সাবজেক্টে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাইভেট পড়ে সেই সকল সাবজেক্টে ক্লাস নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হয় এবং এই প্রতিযোগিতা শিক্ষার পরিবেশকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করছে। শিক্ষকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছাড়াও জাতীয় রাজনীতিও শিক্ষার পরিবেশ দূষিত করে তুলছে। ছাত্র-শিক্ষকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য দরকার রাজনীতিমুক্ত শিক্ষা পরিবেশ।

আমরা যারা পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে স্কুলে-কলেজে পড়েছি তারা সবাই শিক্ষকের হাতে কমবেশি মার খেয়েছি এবং তা নিয়ে আমাদের কোনো আফসোসও নেই। কিন্তু এখন মনে হয়, কোনো কোনো শিক্ষক ছিলেন নিষ্ঠুর ও নির্দয়। তারা এত নির্দয়ভাবে পিটাতেন যে, রাতে আমাদের জ্বর এসে যেত, মা গায়ে তেল মেখে দিতেন। তখন অশিক্ষিত বাবারা সন্তানকে প্রথমদিন স্কুলে নিয়ে শিক্ষকদের বলতেন, ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’। কী নির্মম রীতি! বেত ওঠিয়ে দেওয়ার পরও কিছু শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের এখনো নির্মমভাবে পিটায়। শিক্ষকদের এমন নির্যাতনে অতিষ্ঠ বলেই হয়তো শিক্ষকদের উপর ক্ষুব্ধ ছিল ছাত্র-ছাত্রীরা। কিন্তু তা যদি সত্য হয় তাহলে মাদ্রাসা-মক্তবে শিক্ষক নির্যাতনের বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা। মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রীদের উপর শুধু শারীরিক নির্যাতন হয় না, সেখানে ধর্ষণ আর বলাৎকারের চিৎকারে কর্ণকুহরে তালা লাগাতে হয়। মাদ্রাসায় ছাত্রদের হাত-পা বেঁধে, সিলিং ফ্যানের সাথে টাঙিয়ে যেভাবে পেটানো হয় তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সহ্য করা প্রায় অসম্ভব।

যৌন হয়রানি শুধু মাদ্রাসায় নয়, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির অভিনব কৌশল হচ্ছে, ছাত্রীরা শিক্ষকের যৌন প্রস্তাবে সম্মত না হলে পরীক্ষায় ফেল করে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির আড়ালে ছাত্ররা যেমন টেন্ডারবাজি করে, তেমনি কিছু শিক্ষকও দুর্নীতিতে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। অবশ্য বেতন-ভাতাদি বিবেচনায় দেশে শিক্ষকগণ অনেকটা অবহেলিত। সরকারি অফিসের একজন করণিকের বেতন-ভাতা স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষকের চেয়ে বেশি। তাই শিক্ষকগণ প্রাইভেট বাণিজ্যে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রাইভেট পড়ানোর মধ্যে কোনো অপরাধ নেই, অপরাধ হচ্ছে প্রাইভেট পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী এবং বাকি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি শিক্ষকদের বৈষম্যমূলক আচরণ। যারা প্রাইভেট পড়ে তাদের ইঙ্গিতে শুধু প্রশ্ন বলে দেওয়া হয় না, পরীক্ষায় বেশি নম্বরও দেওয়া হয়। কোনো কোনো শিক্ষক ক্লাসে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেন যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট পড়তে বাধ্য হয়।

শিক্ষকদের নানাবিধ কুৎসিত আচরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষোভ থাকলেও এবারের মতো জোটবদ্ধ প্রতিবাদ আগে কখনো দেখা যায়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সফলতার পর বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের হুমকির প্রেক্ষিতে ভিসি ও শিক্ষকদের পদত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়। ভিন্ন আদর্শের শিক্ষকদের মধ্যে ভয়-ভীতি এত ভয়াবহ ছিল যে, তারা নিজেরা ছাত্র-ছাত্রীদের মুখোমুখি না হয়ে বাসা থেকে বা গোপন আস্তানা থেকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু কাজ ছিল দৃষ্টিকটু—শিক্ষকদের গলায় জুতার মালা পরানো, চড়থাপ্পড় দিয়ে টেনেহিঁচড়ে চেয়ার থেকে মাটিতে ফেলে দেওয়া, গাছের সাথে বেঁধে রাখা ইত্যাদি। শিক্ষকের যত অপরাধই থাকুক না কেন, এভাবে নাজেহাল হওয়ার চিত্র দেখে অভিভাবকরা বিব্রত। শিক্ষকের সন্তানেরাও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, হত মর্যাদা শত অনুতপ্ত দিয়েও ঘুচানো যায় না।

১৯২৪ সনে আমার বাবা আবদুর রশীদ মাস্টার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফেনী জি এ একাডেমী স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে চাকরি করার কোনো আগ্রহ দেখাননি; তিনি ১৯২৬ সনে আমাদের জিএমহাট এলাকায় স্থানীয় জমিদার ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় একটি মাইনর স্কুল (ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জিএমহাট মাইনর স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকও ছিলেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষক-প্রশিক্ষণ না থাকায় পরবর্তীকালে এক সময় তাঁকে প্রধান শিক্ষকের পদ তাঁর ছাত্র-শিক্ষকের হাতে ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু সেই প্রধান শিক্ষককে কখনো বাবার সম্মুখে চেয়ারে বসতে দেখিনি। বাবার প্রায় সমবয়সীরা ছিলেন বাবার ছাত্র, এলাকায় সবাই তাঁকে মাস্টার কাকা, মাস্টার ভাই, মাস্টার সাহেব ইত্যাদি বিশেষণে সম্বোধন করতেন, ফলে আমাদের বাড়ির নাম হয়ে গেল ‘মাস্টার বাড়ি’। তাঁর অবসরকালীন গ্রামের বাজারে আসার পথে তাঁকে তাঁর কোনো ছাত্র অতিক্রম করে সম্মুখে গিয়েছেন এমন কোনো নজির ছিল না। সাইকেল আরোহী ছাত্ররা বাবাকে দেখে বাবার পেছনেই সাইকেল থেকে নেমে যেতেন, সাইকেল ঠেলে ঠেলে বাবার পেছনে পেছনে পথ চলতেন। রাস্তায় চলার পথে কেউ পা ছুঁয়ে সালাম করলে বাবা চিনতে পারতেন না, কিন্তু কেঁদে দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে তাঁর প্রবীণ ছাত্র কবিরাজ কাকা তালগাছের কচি পাতা কেটে নিয়ে নিজ হাতে পাখা করেছেন।

আমরা পাঁচ ভাই, সবাই শিক্ষকতা করেছি। বড় ভাই মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন ১৯৫৪ সনে মেট্রিক পাস করে বিনা বেতনে বাবার স্কুলেই যোগদান করেন। কূটনৈতিক ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৭ সনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পূর্বে দুই বছর ফেনী কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। সেজো ভাই ডা. জহির উদ্দিন আহমেদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অবসর নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর ছেলে ড. শামীম আহমেদ জিতু কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তারপরের ভাই ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন, মাঝখানে লিয়েনে ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভাইস চ্যান্সেলর, এখন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমিও ১৯৮০ সনে একটি কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছি। আমার ছেলে তানভীর আহমেদ অর্ণবও কানাডায় ইংরেজি ভাষার একজন শিক্ষক। শিক্ষকের ঘরে জন্ম, শিক্ষকতা এক সময় পেশা ছিল বলেই বোধ হয় কোনো শিক্ষকের অপমান, লাঞ্ছনা দেখলে ব্যথিত হই, লজ্জায় মুখ লুকাই। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-ছাত্রীদের বিরাট অর্জন; কিন্তু সেই অর্জনের অনেকটুকুই নষ্ট হয়ে গেল শিক্ষক লাঞ্ছনার মহামারিতে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হোক মানবসমাজ এবং গর্বিত হোক মানবজাতি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র জমা না দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক ছাত্র-মুক্তিযোদ্ধার উদ্দেশ্যে খান আতা তার বিখ্যাত সিনেমা ‘আবার তোরা মানুষ হ’ তৈরি করেছিলেন; ‘নতুন স্বাধীনতার’ বীর সেনানীদের নিজ হাতে বিচার তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে ছাত্র সমন্বয়কদেরও খান আতার মতো সোচ্চার হওয়া জরুরি।