এবার এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে গরু-ছাগল কোরবানি দেওয়া হয়েছে। প্রতীয়মান হয়, দেশে এক বিরাট সংখ্যক মানুষের কোনো অভাব নেই, তারা প্রত্যেকে কোরবানির গরুর জন্য এক লক্ষ টাকা করে ব্যয় করার সামর্থ্য রাখে। ঈদের নামাজ সাড়ে সাত বা আটটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ঈদ-উল-আজহার নামাজ শেষ হওয়ার পর সবাই প্রায় দৌড়ে বাসার দিকে যায়। এবার মসজিদ থেকে সবার আগে বেরিয়েছে মাদ্রাসার ছাত্ররা, এরা পরক্ষণেই হাতে ছুরি নিয়ে চারিদিক ছড়িয়ে পড়ে। কার আগে কে গরু জবাই দেবে, কে কয়টি জবাই করতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় তারা তৎপর হয়ে ওঠে। সমাজে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির গরু আগে জবাই করতে হয়। গাজীপুরের শ্রীপুরে মসজিদ কমিটির সভাপতির গরু জবাই করতে দেরি করায় স্থানীয় মসজিদের ইমামকে নাকি চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
মাদ্রাসার যে সকল ছাত্র ছুরি নিয়ে ঘুরছিল তাদের প্রায় সকলের বয়স আঠার বছরের কম। বয়স কোনো ফ্যাক্টর ছিল না, এরা সবাই ‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহু আকবার’ বলে লক্ষাধিক টাকার গরু নিমেষেই জবাই করে ফেলেছে, একটুও হাত কাঁপেনি। একটা জবাই করেই তারা আরেকটি গরুর দিকে ছুটে গেছে, যে যত বেশি জবাই করেছে সে তত বেশি হাদিয়া পেয়েছে। হাদিয়া খুব বেশি নয়, সর্বোচ্চ পাঁচশত টাকা। সাদা পাঞ্জাবি রক্তে রঞ্জিত, এই ক্ষেত্রে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। এভাবে রক্তমাখা পাঞ্জাবি পরে হাঁটতে দেখেছিলাম খুলনার এরশাদ শিকদারকে, পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে উইকেটকিপার মোহাম্মদ মুশফিকুর রহিমকে। কোরবানির গরু জবাই করার মধ্যে একটা তৃপ্তি আছে।
বাল্যকালে দেখেছি কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যেত তা গরিব, মিসকিনদের মধ্যে বিলি করে দেওয়া হতো, এখন আর তা হয় না। এখন সব চামড়া নিয়ে যায় মাদ্রাসার ছাত্ররা। মাদ্রাসাকে চামড়া দিয়ে দিতে ঈদের আগে প্রতিটি মসজিদে বলে দেওয়া হয়। কয়েক বছর কোরবানির চামড়া বিক্রি হয়নি, বিক্রির জন্য ক্রেতাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই চামড়া বিক্রি করার কথা এখন আর কেউ ভাবে না, বরং মাদ্রাসাকে দিতে পেরে সবাই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পায়। এখন মনে হচ্ছে এতিম ও গরিবের হক নষ্ট করার জন্য এই কাজটি করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মমতে কোরবানিদাতা ইচ্ছে করলে চামড়া নিজেরা ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু বিক্রি করে অর্থ ভোগ করতে পারে না। ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে যারা যাকাত, ফিতরা পাওয়ার উপযুক্ত তারাই কোরবানির চামড়ার অর্থ পাওয়ার হকদার; সুরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাতের আটটি খাত নির্ধারণ করা আছে।
কওমি মাদ্রাসাগুলো এখন বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগিয়ে কোরবানির চামড়া মাদ্রাসায় দান করার জন্য আহ্বান করে থাকে এবং মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক ঈদের দিন বিভিন্ন এলাকা থেকে পশুর চামড়া সংগ্রহ করে থাকেন। অনেক আলেমের অভিমত, মসজিদ-মাদ্রাসায় কোরবানির চামড়া দেওয়া যাবে না, কারণ কোরআনে উল্লেখিত আটটি খাতের মধ্যে মসজিদ-মাদ্রাসার কথা নেই। আল্লাহর নির্দেশিত আটটি খাতের মধ্যে গরিব মিসকিনদের উল্লেখ থাকায় অনেক আলেম মাদ্রাসার এতিম-মিসকিনদের কোরবানির চামড়া দেওয়ার পক্ষে কথা বলেছেন। ইসলামি শিক্ষা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট এতিম-মিসকিনদের কোরবানির চামড়া দেওয়ার কথা কিন্তু আমরা বাল্যকালে ওয়াজে শুনিনি, মসজিদের খুতবা বা অভিভাষণেও আগে কখনো বলতে শোনা যায়নি, এখন অহরহ শোনা যায়। কারণ মাদ্রাসাগুলোর টিকে থাকার জন্য কোরবানির চামড়ার আর্থিক সহায়তা জরুরি।
সাধারণত গরিব ও নিঃস্ব পরিবারের সন্তানেরা মাদ্রাসায় পড়ে। নিঃস্ব পরিবারের সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ধর্ম। আমরা যখন মক্তবে পড়তাম তখন বলা হতো, একজন কোরআনে হাফেজ তার বংশের ১৪ গোষ্ঠীকে বেহেশতে নিতে পারবেন। আমাদের দেশের বেশির ভাগ নিরক্ষর ও কম শিক্ষিতরা এমন একটি ধারণা পোষণ করেন যে, সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়ানো হলে বা কোরআনে হাফেজ বানানো গেলে মা-বাবার বেহেশত নিশ্চিত। সমাজে প্রচলিত এমনতর ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকেই তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়াতে উদ্বুদ্ধ হন। কিন্তু এ সম্পর্কে কোরআনে কোনো বক্তব্য নেই, এমনকি কোনো সহি হাদিসও নেই। তবে একটি দুর্বল হাদিসে বলা হয়েছে যে, একজন কোরআনে হাফেজ তার গোষ্ঠীর ১০ জন জাহান্নামী ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। কিন্তু দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ আলেম এই হাদিসটি অগ্রহণযোগ্য বলে মতামত দিয়েছেন। আলেমদের এই সকল মতামত থাকা সত্ত্বেও সমাজে কোনো পরিবর্তন আসছে না, কারণ ভ্রান্ত হলেও সহজে বেহেশতে যাওয়ার পথ কেউ ছাড়তে চায় না।
মাদ্রাসা শিক্ষা বিস্তারের পেছনে আরেকটি কারণ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা; প্রতিটি সরকার মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধির পক্ষে পরোক্ষভাবে কাজ করে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তর সরকারগুলোর চরম ব্যর্থতায় দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা সাধারণ শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকার এখন আর স্কুল-কলেজ করার তাগিদ অনুভব করে না, গরিব ঘরের সন্তানদের স্কুলে আনার কোনো পরিকল্পনাও নিচ্ছে না। গরিব শিশুদের স্কুলে আনার জন্য বিশেষ পরিকল্পনায় শিক্ষাখাতে আরেকটু বেশি বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের জন্য অনুপযোগী বিদেশের বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা, প্রশিক্ষণে মন্ত্রী ও আমলাদের অংশগ্রহণ বন্ধ রেখে সংশ্লিষ্ট সেই অর্থ দিয়েই গরিব পরিবারের সন্তানদের সাধারণ শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব। বিদেশে গিয়ে খিচুড়ির রান্না ও বিতরণ প্রক্রিয়া শিক্ষা গ্রহণের আবশ্যকতা নির্ধারণ প্রকল্প তৈরি করেন যে সকল মন্ত্রী-আমলা, সেই সকল মন্ত্রী-আমলা দিয়ে রাষ্ট্রের অপচয় রোধ করা সম্ভব নয়। এরা দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষা অবশ্যই থাকবে, ধর্মীয় শিক্ষা থেকে সবাইকে দূরে রাখা সম্ভবও নয় এবং প্রয়োজনও নেই। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে শূন্যস্থান সৃষ্টি করে তা মাদ্রাসা দিয়ে পূরণ করার বর্তমান কর্মকাণ্ড জাতির জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সমাজে যারা এককালে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদেরই নাতিপুতি সন্তানেরা তাদের সমান্তরালে এখন মাদ্রাসা তৈরি করে যাচ্ছেন। ২০১৮ সনের একটি পরিসংখ্যান মোতাবেক রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত আট কিলোমিটার মহাসড়কের আশপাশে গড়ে উঠেছে ৬৮টি মাদ্রাসা; এর মধ্যে ৬৬টি ব্যক্তিমালিকানাধীন কওমি মাদ্রাসা, আর বাকি দুটি সরকার-অনুমোদিত আলিয়া মাদ্রাসা। দিন দিন মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়ছে বলেই স্কুলের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কমছে। ভবিষ্যতে মাদ্রাসা আরও বাড়বে, কারণ যারা মাদ্রাসা থেকে পাস করে বের হচ্ছেন তাদের প্রধান কাজ আরও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। টিকে থাকার সংগ্রামে অন্য ক্ষেত্রগুলো মাদ্রাসার ছাত্রদের বিচরণের বাইরে থাকছে বিধায় তাদের অধিকাংশ মসজিদের ইমামতি, মাদ্রাসা ও মক্তবের শিক্ষকতা, স্কুলের ধর্ম শিক্ষকের পদে চাকরি খুঁজে নিচ্ছেন। তাই মাদ্রাসা থেকে পাস করা ছাত্রদের কর্মসংস্থানের জন্যই আরও মাদ্রাসা গড়ে ওঠছে। অন্যদিকে গণতন্ত্রের একটি বড় কুফল হচ্ছে, আস্তিক-নাস্তিক-ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ সব প্রার্থী নির্বাচনের সময় অকাতরে মাদ্রাসায় দান করে থাকেন; মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও বাছবিচার না করে সেই দান অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করছেন। নির্বাচনে প্রার্থীদের অবৈধ টাকার ছড়াছড়ি থাকায় মাদ্রাসাগুলো সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। যারা রাজনৈতিক স্বার্থে মাদ্রাসাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে তাদের কোনো সন্তান কিন্তু মাদ্রাসায় পড়ছে না।
সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও বিরাজমান রাজনীতির অনুকূল পরিবেশে দেশের আনাচে-কানাচে মাদ্রাসা গড়ে ওঠছে। ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার সুস্থ রাজনীতি না থাকার কারণেও মাদ্রাসা শিক্ষা সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। এই বিরাট জনগোষ্ঠীকে সব রাজনৈতিক দল তোয়াজ করে ক্ষমতায় যেতে চায়, ক্ষমতায় থাকতে চায়। মাদ্রাসার বড় জনবলকে নিজেদের পক্ষে রাখতে পাকিস্তান আমল থেকেই আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে একটি পক্ষ। একাত্তরে পরাজিত ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে ব্যক্তির ‘ধর্মহীনতা’ বলে প্রচার করে সফলও হয়েছে। কারণ দেশে আলোকিত মানুষের অভাব থাকায় নেতিবাচক বক্তব্যও বিনাবাক্যে গৃহীত হচ্ছে, শিক্ষিত লোকগুলোও গুজব এবং মিথ্যা প্রচারে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। মাদ্রাসা শিক্ষা বিস্তারে এই সুযোগগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে।
কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় সরকারের অনুমোদন লাগে না, তারা সরকার থেকে কোনো অনুদানও গ্রহণ করে না। তাদের অর্থের প্রধান উৎস পাড়া-প্রতিবেশী, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইসলামিক প্রতিষ্ঠান থেকে আসা অনুদান এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত অর্থ। কওমি মাদ্রাসার সাথে সংশ্লিষ্ট আলেমরা তাদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানে সরকারের হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিজ্ঞান শিক্ষার সাথে সমন্বয় করে পাঠ্যসূচী প্রণয়নে আলেমদের অনীহা থাকায় তা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব; কারণ আলেমগণ মনে করেন ঈমানবিবর্জিত বস্তুবাদী শিক্ষা হচ্ছে ‘তাগুত’ শিক্ষা, এই শিক্ষা ইহকাল-পরকাল দুটোই ধ্বংস করে। তারপরও অনেক আলেম ইদানীং বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী আগ্রহী হয়ে উঠছেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেন ইহকালে টিকে থাকতে বলে বিজ্ঞান শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই; তারা বুঝতে পেরেছেন, বস্তুবাদী শিক্ষা বাদ দিলে বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের টিকে থাকার সম্ভাবনা ডাইনোসরের মতো হতে পারে।
