গাজায় ইসরায়েলের সশস্ত্র বাহিনীর চলমান হত্যাযজ্ঞে যুক্তরাষ্ট্রের অকুণ্ঠ সমর্থনের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদস্বরূপ পঁচিশ বছর বয়সী মার্কিন বিমানবাহিনীর সদস্য অ্যারন বুশনেল যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের সম্মুখে নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহনন করেছেন। শরীরে আগুন যখন জ্বলছিল তখন তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ফ্রি ফিলিস্তিন’ বা ‘মুক্ত করো ফিলিস্তিনকে’। আত্মহননের ভিডিওটি আমি দেখেছি শুধু একবার, পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যতবারই ভিডিওটি নজরে এসেছে ততবারই এড়িয়ে গেছি। না বুঝে প্রথমবার দেখেছি। বিমানবাহিনীর পোশাক পরা একজন লোক ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে, কতদূর গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের গায়ে পেট্রোল ঢাললো, আর আগুন দিয়ে নিজের শরীর প্রজ্বলিত করল, ফিলিস্তিনের পক্ষে কয়েকটি চিৎকার শুনলাম, যুবকটি মরে গেল। এই দৃশ্য কোন সুস্থ লোকের পক্ষে দ্বিতীয়বার দেখা সম্ভব বলে আমি মনে করি না।

ইসরায়েলের নির্দেশে উত্তর গাজা থেকে সরে যেতে যেতে গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে মিশরের সীমান্তবর্তী রাফাহ শহরে। ওখানেও বোমা ফেলা হচ্ছে। যুদ্ধের মধ্যে গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ইসরায়েল প্রায় সব হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আহত লোকদের চিকিৎসার জন্য বিছানা নেই, ওষুধ নেই, অপারেশন-থিয়েটর নেই, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম নেই। গাজায় আক্রমণের শুরুতেই ইসরায়েল বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। খাবারের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে গাজাবাসী। আমেরিকার নির্দেশে কাতার আর মিশর যুদ্ধে বন্ধে বৈঠকের পর বৈঠক করে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলো আমেরিকার রাজনৈতিক দাবার গুটি, আমেরিকা যেভাবে চাল দিচ্ছে সেভাবে নড়াচড়া করছে। মুসলিম খেলাফতের নব্য সুলতান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বোবা হয়ে গেছেন। মিসকিন হলেও বাংলাদেশের মুসলমানেরা অতিরিক্ত উম্মা ভক্ত, তাদের মুখেও এখন আর জিহাদের স্লোগান শোনা যায় না। মিশর আর কাতারের দূতিয়ালি না থাকলেও যুদ্ধ যখন থামার তখন থামবে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যেদিন বলবেন, ‘যুদ্ধ বন্ধ’, শুধু সেদিনই যুদ্ধ থামবে। ইতোমধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী রোজার আগে যুদ্ধ থামানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। ৩০ হাজার গাজাবাসীর মৃত্যু মুসলিম দেশগুলোকে বিচলিত করেনি, বিচলিত করেছে শুধু একজন আমেরিকার বিমানবাহিনীর সদস্যকে।

সারা পৃথিবীতে মানুষ অহরহ আত্মহত্যা করছে, প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে। তীব্র হতাশা, অবহেলা, প্রেমে ব্যর্থতা, নেশায় আসক্তি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, গৃহহীনতা ইত্যাদি কারণে চরম মানসিক বিপর্যয়ে মানুষ আত্মহত্যা করে। এছাড়াও ধর্ষণের লজ্জা থেকে মুক্তি পেতেও অনেকে আত্মহত্যা করে। নিরাময়-অযোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত আমার এক নানী শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৯৭১ সনের ২৫ মার্চ ফাঁস দিয়েছিলেন। পরাজয়ের গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে হিটলার আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নরের পদাবনতি হলে তিনি নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। পরীক্ষায় ফেল করার পর পরিবারের সদস্যদের ভর্ৎসনা সহ্য করতে না পেরে অনেক ছাত্র-ছাত্রী আত্মহত্যা করে। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ধরা পড়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ভারতবর্ষের অনেক বিপ্লবী আত্মহত্যা করেছেন। নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে কিছু কয়েদী বিদ্যুতায়িত বেড়া স্পর্শ করে নিজেদেরকে হত্যা করেছে। মনোমালিন্যের চরম পর্যায়ে স্বামীর শারীরিক আঘাতের পর ফাঁসি দেওয়া এক নারীকে গাছের ডালে ঝুলতে দেখেছি বাল্যকালে। লসের মাত্রা বেশি হলে জুয়াড়িরাও আত্মহত্যা করে। শেয়ারে বিপুল অর্থ খুইয়ে জাপানের এক ব্যবসায়ী হারাকিরি করে আত্মহত্যা করেছিল। কিন্তু এই সকল আত্মহত্যার তুলনায় অ্যারন বুশনেলের আত্মহত্যার ওজন ও মহিমা অনেক বেশি।

অন্যের জীবনহানি ঘটানোর উদ্দেশ্যে আজকাল রাজনৈতিক কারণে অনেকে আত্মঘাতী বোমা ফাটিয়ে নিজেকে নিজে মেরে ফেলছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এক আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে মার যান। পাকিস্তানে প্রায় প্রতিদিন আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণে অসংখ্য লোক মারা যাচ্ছে। নাইজেরিয়ার জিহাদি জঙ্গি সংগঠন বোকো হারামের কিশোর-কিশোরীরাও আত্মঘাতী হয়ে থাকে। ২০০১ সনে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে যারা বিমান হামলা করেছিল তারাও ছিল আত্মঘাতী। খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান দার্শনিক ও নাট্যকার সেনেকা এবং প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তার ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যাণ্ড দ্য সি’ উপন্যাসে জীবনযুদ্ধে হার না মানার প্রত্যয়কে তুলে ধরলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি তা রক্ষা করতে পারেননি, তাকেও আত্মহত্যা করতে হয়েছিল। উল্লেখিত আত্মহত্যাগুলোর সাথেও অ্যারন বুশনেলের আত্মহত্যার কোন মিল নেই, অ্যারনের আত্মহত্যা মানবতার জয়গানে উদ্ভাসিত।

ইউরোপসহ পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত দেশে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে এখন আর অপরাধ বলে মনে করা হয় না। এর প্রধান কারণ ব্যক্তিজীবনে ধর্মের প্রভাব কমে যাওয়া। সৃষ্টিকর্তা জীবন দিয়েছেন, তাই সৃষ্টিকর্তাই জীবন নেবেন—এই তত্ত্বে বিশ্বাসী লোকেরা সচরাচর আত্মহত্যা করে না। কারণ প্রায় সকল ধর্মেই আত্মহত্যা মহাপাপ। ইসলাম ধর্মমতে আত্মহত্যাকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। অধিকাংশ মুসলিম দেশ ধর্মীয় বিধান মেনে চলে বিধায় আত্মহত্যার চেষ্টা করে কেউ বেঁচে গেলে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।

এতদসত্ত্বেও আমরা কিছু আত্মহত্যার যৌক্তিক কারণ খুঁজি, আত্মঘাতীর প্রতি সহানুভূতি দেখাই। অ্যারনের আত্মহত্যাকে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য শত শত আমেরিকান ফিলিস্তিনি তার উদ্দেশ্যে তার মৃত্যুবেদিতে ফুল দিচ্ছে, মিছিল করে তার জয়গান করছে।

অ্যারন কার জন্য আত্মাহুতি দিলেন? তিনি তো ফিলিস্তিনি বা মুসলমান নন, ফিলিস্তিনিদের সাথে তার কোন সম্পর্কও নেই। তিনি বাহ্যত খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী, তিনি আমেরিকার নাগরিক, তিনি মার্কিন বিমানবাহিনীর একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, মাত্র তিন বছর আগে চাকরিজীবন শুরু করেছেন, তিনি বয়সে তরুণ, বিয়ে করেছেন কি না জানি না, বউ বা সন্তান না থাকলেও মা-বাবা তো আছেন—মৃত্যুর পূর্বে কি একবারও তাদের কথা মনে পড়েনি? পড়েনি; পড়লে তিনি অন্যের জন্য আত্মাহুতি দিতে পারতেন না। তিনি তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ইসরায়েলের গণহত্যায় তার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থন ও সহায়তায় তিনি বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। মানুষ নির্মম বর্বরতা তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই অ্যারন তার জীবন দিয়ে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। তিনি ধার্মিক হলে এই কাজ করতেন না, তিনি রাজনীতির লোক হলেও এই কাজ করার গরজ বোধ করতেন না। তবে তিনি অবগত ছিলেন না যে, এই গণহত্যার পেছনে শুধু আমেরিকা ইন্ধন যোগাচ্ছে না, ইন্ধন যোগাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোও। রাজা-বাদশাহ আর সেনাশাসকদের ভয় ইসরায়েল নয়, তাদের ভয় ইরান এবং হামাস। তাই হামাসের ডানা ভাঙতে আমেরিকার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোও একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।

হলিউড অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্নের মতো দেখতে ফিলিস্তিনি তরুণী লায়লা খালেদ ১৯৬৯ সনে রোম থেকে এথেন্সগামী একটি ইসরায়েলি বিমান ছিনতাই করে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিলেন। বিমান ছিনতাইয়ের সময় একে-৪৭ রাইফেল হাতে তার যে ছবি তোলা হয় সেই ছবিটিই সারা দুনিয়ায় বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। পুনরায় বিমান ছিনতাই করার অভিপ্রায়ে গণমাধ্যমে পরিচিত চেহারায় ছয়বার প্লাস্টিক সার্জারি করান এবং পরিবর্তিত চেহারার লায়লা হাসান ১৯৭০ সনে আমস্টারডাম থেকে নিউইয়র্কগামী আরেকটি বিমান ছিনতাই করে ধরা পড়েন; পরে বন্দী বিনিময়ের চুক্তিতে মুক্তি পান। আইনের চোখে তার বিমান ছিনতাইয়ের কাজ অপরাধ পদবাচ্য হলেও নিপীড়িত ও মানবতায় বিশ্বাসী মানুষের কাছে তা গর্হিত বিবেচিত হয়নি। কোন জীবনহানি করা তার লক্ষ্য ছিল না, বিমান ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল অসহায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। অ্যারন বুশনেলও একই কাজ করেছেন, ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার লক্ষ্যে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়েছেন। শক্তিশালী আমেরিকার মদদে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জনগণের নিধনে একগুঁয়ে, একরোখা। যুদ্ধ বন্ধের সকল প্রচেষ্টায় বাধা দিয়েছে আমেরিকা, যুদ্ধ বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদের উত্থাপিত প্রস্তাবে আমেরিকা বারবার ভেটো দিয়েছে। গাজায় চলমান গণহত্যার জন্য অ্যারন তাই আমেরিকাকে দায়ী করেছে। তিনি পরকালের বেহেশতের জন্য লালায়িত ছিলেন না। নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে কবি সুকান্তের মতো পৃথিবীকে মানুষের জন্য বাসযোগ্য করার স্লোগান শুনিয়ে গেছেন।

বহু বছর পর লায়লা খালেদকে এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়—‘আপনি যা করেছেন তার জন্য আপনি কি অনুতপ্ত’? লায়লা খালেদের উত্তর ছিল ‘মোটেই না’।

তদ্রূপ নিজের শরীরে আগুন লাগানোর পূর্বে অ্যারনও চিৎকার করে বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে দিয়ে গেছেন, উপনিবেশকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিরা নির্যাতনের যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে, সে তুলনায় তার আত্মাহুতি কিছুই না।