১৯১৭ সনে অটোমানদের কাছ থেকে ইহুদি-খ্রিস্টান-ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডের দখল নেয় ব্রিটেন; এই এলাকাটি উক্ত তিন ধর্মের লোকই দখল করেছে, দখল করে অন্য ধর্মের লোকদের কচুকাটা করেছে, পরাজিত হয়ে অনেকে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। ইসরাইল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই এলাকায় কোন স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ ছিল না। সত্তর শতকে রোমান শাসকদের অত্যাচারে ইহুদিরা জেরুজালেম ছেড়ে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপে নিপীড়িত, নির্যাতিত ইহুদিরা ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সন পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসকদের সহায়তায় পুনরায় দলে দলে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন করে। জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নগরী ঘোষণা করে ১৯৪৭ সনে জাতিসংঘ ইহুদি এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে জমি ভাগ করে দিয়ে একটি মানচিত্র প্রণয়ন করে। ফিলিস্তিনসহ কোন আরব রাষ্ট্র তা মানেনি। ১৯৪৮ সনের যে দিন (১৪ মে) ব্রিটেন ফিলিস্তিন ছেড়ে দেয় সেদিনই ইহুদিরা ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়।

জাতিসংঘের মানচিত্র অনুযায়ী ইহুদিরা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করলে পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলকে ভূমধ্যসাগরে ডুবানোর লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে নামে, কিন্তু যুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর শুধু পরাজয়ই ঘটেনি, ভূমিও হারায়। বিভিন্ন যুদ্ধে মানচিত্রে নির্দেশিত নিজেদের অংশ ধরে রাখার পাশাপাশি পশ্চিম জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনের জন্য বরাদ্দকৃত ভূমির অর্ধেকেরও বেশি ইসরাইল দখল করে নেয়। জর্ডানের সেনাদের শক্ত অবস্থানের কারণে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম দখল করতে পারেনি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে দুই বছর পর ১৯৫০ সনে জর্ডান নিজেই ফিলিস্তিনিদের আবাসভূমি পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীরের মুক্ত এলাকাগুলোকে নিজেদের ভূমি হিসেবে জর্ডানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। অবশ্য এই অন্তর্ভুক্তি জর্ডানের রাজতন্ত্রের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ ১৯৪৮ সনের যুদ্ধের সময় বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি শরণার্থী জর্ডানে আশ্রয় নিয়েছিল, এবার পূর্ব জেরুজালেমকে জর্ডানের সাথে অন্তর্ভুক্ত করায় জর্ডানের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ হয়ে যায় ফিলিস্তিনি। এর ফলে জর্ডানীয় নাগরিকরাই নিজ দেশে হয়ে যায় সংখ্যালঘু।

ষাটের দশকে জর্ডানসহ বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বড় হওয়া ফিলিস্তিনি যুবকদের স্কুল ছিল না, কোন কাজ ছিল না, অলস বসে বসে মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুল নাসেরের বিপ্লবী ভাষণ শুনতে শুনতে নিজেদের আবাসভূমি উদ্ধারের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া শিখে নেয়। ১৯৬৪ সনে ফিলিস্তিন যুবকদের কয়েকটি নতুন সংগঠন একত্রিত হয়ে গঠন করে পিএলও বা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন। জর্ডানে বসবাসকারী ফিলিস্তিন সশস্ত্র যুবকেরা জর্ডান সরকারের কথা শুনত না, জর্ডানের ভেতর তাদের নিজস্ব ইউনিফর্ম ও বিচারব্যবস্থা ছিল, নিজেদের খেয়ালখুশি মতো ইসরাইলে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতো এবং ইসরাইল জবাবে জর্ডানের ভেতর বিমান হামলা করত। এত বিপুল সংখ্যক পিএলও গেরিলার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা জর্ডানের পক্ষে সম্ভবও ছিল না। আক্ষরিক অর্থে ফিলিস্তিনিরা গড়ে তোলে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র। তারা প্রকাশ্যেই বাদশাহ আব্দুল্লাহ বিন হুসেইনকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দিতে শুরু করে। তাদের দৃষ্টিতে জর্ডানের বাদশাহ বহিরাগত, সৌদি আরব থেকে আসা হাশেমী রাজপরিবারের লোক।

১৯৭০ সনে বাদশাহ হুসেইন জর্ডান থেকে ফিলিস্তিনদের উচ্ছেদ করতে সমর্থ হন। এই উচ্ছেদ অভিযানে ভাড়াটে পাকিস্তানি সৈন্য অংশ নিয়েছিল। জর্ডানের ভাগ্য খারাপ, ফিলিস্তিনিদের জর্ডান থেকে তাড়িয়েও ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখলে রাখতে পারেনি। ইসরাইল ১৯৬৭ সনে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে জর্ডানের কাছ থেকে পূর্ব জেরুজালেম ছিনিয়ে নেয়। এই যুদ্ধে ইসরাইল মিশরের কাছ থেকে গাজা ভূখণ্ড ও সিনাই উপদ্বীপ এবং সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমিও দখল করে। ফলে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জন্য আর কোন জায়গায়ই থাকল না, উদ্বাস্তু হয়ে পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো।

১৯৭৩ সনে মুসলিম দেশগুলো আবার যুদ্ধে নামে, প্রথমদিকে মিশরের সেনারা কিছুটা এগিয়ে গেলেও আমেরিকার ত্বরিত অস্ত্র সরবরাহ পেয়ে ইসরাইল মিশরকে হটাতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত মিশর এবং সিরিয়া ইসরাইলের সেনাদের সম্মুখে দাঁড়াতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো মুসলিম দেশের সমর্থন এবং সার্বিক সহায়তা থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৩ সনে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে টিকতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বলেছিলেন, ‘আমরা ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ করতে পারি, কিন্তু আমেরিকার সাথে নয়’। মিশর ক্যাম্প ডেভিড শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করে সিনাই উপদ্বীপ ফিরে পায় এবং আমেরিকাও মিশরকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এরপর থেকে মিশর ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখেছে। শুধু জর্ডান এবং মিশর নয়, নতুন করে আরো কয়েকটি মুসলিম দেশও সম্প্রতি ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। তাই পূর্বের মতো জোটবদ্ধ হয়ে মুসলিম দেশগুলোর ইসরাইলকে আক্রমণ করার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।

গাজা অঞ্চলেরও একটি ইতিহাস আছে। ১৯৪৮ সনে মিশর জাতিসংঘের তরফ থেকে গাজা অঞ্চল পরিচালনার দায়িত্ব পায়, কিন্তু ১৯৬৭ সনে ইসরাইল তা দখল করে নিলে মিশরের দায়িত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। গাজা খুব ছোট এলাকা, মাত্র ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ কিলোমিটার প্রশস্ত। মাত্র ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট এই গাজা উপত্যকায় ২৩ লক্ষ ফিলিস্তিনির বাস। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এই গাজা। আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে ইসরাইল ২০০৫ সনে গাজা ও জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর ফিলিস্তিনিদের জন্য ছেড়ে দেয়। ছেড়ে দিলেও গাজা ভূখণ্ডটির তিন দিক অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরাইল এবং মিশর। এখনো ইসরাইল গাজা এবং এর উপকূলীয় এলাকার আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে কারা যাতায়াত করবে ও কী ধরনের পণ্য প্রবেশ করতে পারবে তা তদারকি করে। গাজার তিন দিকে ইসরাইল রাষ্ট্র হলেও মিশরের সাথে গাজার একটি চিকন করিডোর আছে। ইসরাইলের মতো মিশরও একইভাবে গাজা সীমান্ত দিয়ে ফিলিস্তিনিদের গমনাগমন নিয়ন্ত্রণ করে। এই গাজা ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল; কিন্তু পার্লামেন্ট নির্বাচনে হামাসের বিজয়ের এক বছর পর ২০০৭ সনে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়; এতে ইসরাইল ও মিশর গাজায় অবরুদ্ধ অবস্থা আরও জোরদার করে, যাতে হামাসদের কেউ অস্ত্র সরবরাহ করতে না পারে।

গাজা ছাড়াও ফিলিস্তিনিদের আরও একটি ভূখণ্ড রয়েছে, জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর। পবিত্র জেরুজালেম নগরী এবং মসজিদ আল-আকসা বা টেম্পল অব ডোম এই পশ্চিম তীরেই অবস্থিত। ১৯৯৩ সনে সম্পাদিত অসলো চুক্তির আওতায় ইসরাইল জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর পুনরায় ফিলিস্তিনিদের হাতে ছেড়ে দেয় এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ৫ বছরের জন্য ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ গঠন করে। কথা ছিল এই পাঁচ বছরের মধ্যে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে সংঘাত নিরসনে আলোচনা চালিয়ে বিদ্যমান অন্য সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। এই চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনের স্বায়ত্তশাসন স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে মেনে নেওয়া হয়। ওই চুক্তির জন্য তখনকার পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছিলেন।

ধারণা করা হয়েছিল চুক্তির কথা অনুযায়ী আলোচনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত হবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। বিভিন্ন রাষ্ট্রের উদ্যোগে বহু আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অসলো চুক্তির ৫ বছর পর ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের জায়গায় একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার কথা, কিন্তু আজ পর্যন্ত মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষই ক্ষমতায় রয়ে গেছে। এছাড়াও গাজা এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনের উপর ইসরাইলের কর্তৃত্ব এখনো বহাল রয়েছে, এখনো পশ্চিম তীরে তারা বসতি স্থাপন করেই যাচ্ছে। শান্তিচুক্তি যখন স্বাক্ষরিত হয় তখন পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি ছিল এক লাখ দশ হাজার, আর এখন সেই সংখ্যা সাত লাখ। গাজা এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইলিদের সংঘাত কখনো থামেনি; হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে বহুবার রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়েছে। হামাসকে শুধু ইসরাইলের সাথে নয়, ২০০৭ সনে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনদের সাথেও লড়াই করতে হয়েছে।

হামাস ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী, তাই সম্ভবত বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাজতন্ত্র হামাসের শক্তিকে ভয় করে। মিশরের ইসলামপন্থী ব্রাদারহুডের শাখা সংগঠন হচ্ছে হামাস গোষ্ঠী। ব্রাদারহুড সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অভিধায় মিশরে বর্তমানে নিষিদ্ধ। তাই মিশরও হামাসের উত্থান সহ্য করে না। মুসলমানদের একটি অংশ হামাসকে ইসলামি দল মনে করলেও অনেক আলেমের মতে এই দলের অনুসারী যোদ্ধারা মুরতাদ বা ধর্মচ্যুত। হামাস মুসলমান বলে সমর্থন করলে আমাদের সমর্থনের তাৎপর্য গৌণ হয়ে যায়, অন্য ধর্মাবলম্বীদের সমর্থন আদায় করার অধিকার থাকে না। হাসান শুধু মুসলমান হলে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে কলম্বিয়া বহিষ্কার করবে কেন? হামাস অন্যায়ভাবে নির্যাতিত হচ্ছে বলেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানবিক মানুষের হামাসের পক্ষে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

হামাস নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে ফিলিস্তিনিদের ভূমি উদ্ধারপূর্বক আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলারও কেউ থাকবে না, সমঝোতা ও আপসে ফিলিস্তিন এলাকায় কবরের শান্তি বিরাজ করবে।