ঢাকা শহরের একটি অভিজাত এলাকার উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নৌকা প্রতীকে মোহাম্মদ আলী আরাফাত ২৮ হাজার ৮১৬ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী একতারা প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল হোসেন আলম বা হিরো আলম পেয়েছেন ৫ হাজার ৬০৯ ভোট। হিরো আলম বগুড়ার একটি আসনে মাত্র ৮৩৪ ভোটের ব্যবধানে মহাজোটের প্রার্থী জাসদ নেতা এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনের কাছে পরাজিত হয়েছেন। তিনি ২০১৮ সনের সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন চেয়েছিলেন, না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন; তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দুইবার প্রার্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি— তাকে নিয়ে এখন পত্রিকার হেডিং হয়, টকশোতে তার ডাক পড়ে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব করেন, বিরোধী দলের সমর্থকরা তার প্রচার-প্রচারণায় গলদঘর্ম। বিরোধী দলের সমর্থকদের বক্তব্য হচ্ছে, লিখিত বক্তব্য পাঠ করতে পারে না এমন ব্যক্তি সাংসদ হতে পারলে হিরো আলম হতে পারবে না কেন? বিএনপি তাকে বগুড়ায় মনোনয়ন দিলে হিরো আলম অবশ্যই সাংসদ হবে। কিন্তু দেবে না। কাউকে নিয়ে খেলা করা, আর মনোনয়ন দেওয়া এক কথা নয়। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে হিরো আলমের পজিশন জিরো হয়ে যাবে।
নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে হিরো আলমের উপর আক্রমণ হয়েছে, আক্রমণে নৌকার প্রতীকধারী ছিল। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি, কারণ প্রচার চলাকালে মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে আরেকটি সংঘাতে হিরো আলম যেভাবে মারমুখী হয়ে একজনের দাড়ি ধরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাতে তাকে অস্থিরচিত্তের লোক বলে মনে হয়েছিল। বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল মাঠে ভোটের দিন কিছু লোকের সাথে হিরো আলমের বাদানুবাদ হয়, বাদানুবাদের সময় হিরো আলমকে পুলিশদের ডিঙ্গিয়ে কয়েকবার তার প্রতিপক্ষের দিকে তেড়ে যেতে দেখা যায়। বাদানুবাদ থামিয়ে পুলিশ তাকে গেইটের বাইরে পার করে দেওয়ার পরপর তাকে কিছু যুবক আক্রমণ করে। এমন উত্তপ্ত পরিবেশে হিরো আলমের উচিত ছিল পুলিশ প্রোটেকশন চাওয়া, অথবা পুলিশের নিজস্ব বিবেচনায় হিরো আলমকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া। অবশ্য নির্বাচনকালীন সার্বক্ষণিক হিরো আলমকে পুলিশ প্রোটেকশনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ইতোমধ্যে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে। সত্য বের করা দরকার।
বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী হিরো আলমকে অর্ধপাগল-অর্ধশিক্ষিত বলে অভিহিত করেছেন। বেসুরো গলায়, উদ্ভট কথা ও সুরে গান করে হিরো আলম ইতোমধ্যে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছেন। ইউটিউবে অসংখ্য লোক তার গান শোনে, লাইক দেয়, শেয়ারও করে। বিশ্রী সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার পর পুলিশ তাকে ধরেও নিয়ে গিয়েছিল, বিশুদ্ধ সুরে গান গাওয়ার পরামর্শ দিয়ে কিছুক্ষণ পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাকে নিয়ে কিছু শিক্ষিত লোকের মাতামাতি দেখে অভিনেতা মামুনুর রশীদ ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ মন্তব্য করে কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। হিরো আলমকে নিয়ে নির্বাচনবিমুখ বিরোধী দলের সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খেলা করছেন, নির্বাচনের অসারতা প্রমাণের জন্য হিরো আলমকে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হতে উৎসাহ যোগাচ্ছেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে হিরো আলমই উপযুক্ত বলে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে আওয়ামী লীগ হিরো আলমের কাছেও অসহায়। হিরো আলম শুধু অভিনয় করে ‘হিরো’ উপাধি নেননি, এখন তিনি রাজনীতির মাঠেও হিরো।
শুধু হিরো আলম জাতীয় নির্বাচনে আলোড়ন তোলেননি, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হয়ে প্রথম আলোড়ন তুলেছিলেন সিলেটের ছয়ফুর রহমান। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ছয়ফুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বিএনপি’র প্রার্থী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ড. কামাল হোসেনের সাথে। তিনি ছিলেন গ্রামীণ হাটে একটি ছোট্ট হোটেলের বাবুর্চি, হোটেলে কাজ না থাকলে তিনি ঠেলাগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে বারবার জামানত হারালেও নির্বাচন থেকে তিনি সরে যাননি; ১৯৯০ সনে শক্তিশালী একজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে ২২ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি সিলেট সদর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই বিজয়ের পর তিনি ‘ছক্কা’ ছয়ফুর রহমান নামে পরিচিতি লাভ করেন।
আওয়ামী লীগ বা বিএনপি’র সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার প্রত্যাশায় কিছু লোক অনবরত রাজনৈতিক দল গঠন করে যাচ্ছেন; ইতিমধ্যে ৯৩টি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে মাত্র ২টি নিবন্ধন পেয়েছে। কারণ তাদের প্রদত্ত তালিকায় উল্লেখিত সমর্থকদের মাঠপর্যায়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোন কোন দলের সদস্যদের পরিচয় সম্ভবত দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকও জানেন না। দলীয় পরিচয়ে প্রার্থী হলে এদের কেউ নিজের ভোট ছাড়া আর কারো ভোট পাবেন বলে মনে হয় না, কিন্তু এদের হুঙ্কার সিংহের গর্জনের মতো পাঁচ মাইল দূর থেকেও শোনা যায়। ছক্কা ছয়ফুর রহমানও ‘ইসলামী সমাজতান্ত্রিক দল’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন, কিন্তু তিনি বিভিন্ন ভুঁইফোঁড় রাজনৈতিক দলের মতো আওয়ামী লীগ বা বিএনপি’র জোটে যাওয়ার বাসনা করেননি। তার দলের তিনিই ছিলেন একমাত্র সদস্য; তিনি আর কাউকে, এমনকি তার স্ত্রীকেও দলের সদস্য করেননি। কাউকে সদস্য না করার ব্যাপারে তার যুক্তি ছিল, বেশি লোক হলেই ঝামেলা; দুই জন হলেও দল ভাগ হয়ে যেতে পারে।
গুলশান, বনানী, বারিধারা এবং সেনানিবাসের একাংশ নিয়ে ঢাকা-১৭ আসনটি গঠিত; এই আসনের মোট ভোটার ৩ লক্ষ ২৫ হাজারের একটু বেশি। সোয়া তিন লক্ষ ভোটারের মধ্যে মাত্র ৩৭ হাজার ৪২০ জন ভোটার ভোটকেন্দ্রে এসেছেন, যা মোট ভোটারের ১১.৫১ শতাংশ মাত্র। নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর এবারই প্রথমবারের মতো কোন নির্বাচন ব্যালটে অনুষ্ঠিত হলো। ব্যালট ভোট প্রদানে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক না হওয়ায় জালভোট রোধ করা কঠিন। ভোটারের এত কম উপস্থিতির প্রধান কারণ বিএনপি’র ভোট বর্জন। বৃহত্তর রংপুর এবং সিলেট ব্যতীত দেশের অন্যত্র ভোটের মাঠে বিএনপি না থাকলে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয় না। রংপুর এবং সিলেটে জাতীয় পার্টির অবস্থান ভালো বলে ভোটের আমেজ সৃষ্টিতে বিএনপি’র প্রার্থীর প্রয়োজন হয় না। নির্বাচনে জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও ভোট দেওয়ার গরজ বোধ করেননি। ভোটারের কম উপস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, পাঁচ মাসের জন্য কোন সাংসদকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করতে কারো উৎসাহ ছিল না। সর্বোপরি আমাদের দেশে ভোট প্রদান বাধ্যতামূলক নয়, অস্ট্রেলিয়ায় ভোট না দিলে জরিমানা দিতে হয়। পাশ্চাত্য দেশেও ভোট প্রদানে নতুন প্রজন্ম আগ্রহী নয়, রাজনীতির ব্যাপারেও তাদের মারাত্মক অনীহা। আমাদের দেশেও ভোটের প্রতি নতুন প্রজন্মের খুব বেশি আগ্রহ নেই।
নির্বাচনকে অর্থবহ করতে হলে নির্বাচনে বিএনপি’র অংশগ্রহণ অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে তার নিরসনের কোন সহজ পথ নেই। ইতঃপূর্বে এমন অবস্থায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। অন্যবারের চেয়ে এবারের নির্বাচনের আইনগত প্রেক্ষিত ভিন্নতর ও জটিল। তত্ত্বাবধায়ক বা দলনিরপেক্ষ সরকারে জনগণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় এই ব্যবস্থাকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট ‘অবৈধ’ বলে রায়ে উল্লেখ করেছে। আইনের দৃষ্টিতে যে সরকারব্যবস্থার বৈধতা নেই সেই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে উদ্ভূত অচলাবস্থার অবসান ঘটানো কঠিন। বিএনপি কাটাছেঁড়ার সংবিধান চায় না, তারা চায় অখণ্ড সংবিধান। কিন্তু অখণ্ড সংবিধানে তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল না। বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে অভিযুক্ত করে বিএনপি সমস্যার উত্তরণ ঘটাতে পারবে না। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনঃসংযোজনও সম্ভব নয়। তবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু এক্ষেত্রেও সমস্যা, বিএনপি’র সাংসদগণ পদত্যাগ করেছেন। এখনো টেকনোক্রেট মন্ত্রীর মাধ্যমে বিএনপি-কে জনপ্রতিনিধির তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে নিশ্চয়ই বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নিজস্ব ছক রয়েছে। সংঘাত বা নির্বাচন যাই হোক না কেন তাতে বিএনপি’র কর্মীরা থাকবে উজ্জীবিত, কারণ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা উদ্গ্রীব, তারা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে তাদের কর্মী-সমর্থকদের অনেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, নানা অপকর্ম করে আওয়ামী লীগের ইমেজ নষ্ট করেন, যেমন করেছেন হিরো আলমকে আক্রমণ করে। কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়া এখন আওয়ামী লীগের বিরোধী শিবিরের হাতে। এই মাধ্যমে বিরোধী দলের সমর্থকদের কর্মকাণ্ড দেখলে হতবাক হতে হয়, বিভিন্ন জনের মেসেঞ্জারে সত্য-মিথ্যার নানা ভিডিও ক্লিপ গোয়েবলসীয় কায়দায় অবিরত বিলি করা হচ্ছে, গ্রহণ-বর্জনের ক্ষমতা না থাকায় শুধু সাধারণ লোক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষও বিভ্রান্ত হচ্ছেন, মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্টদের অপপ্রচারে কলুষিত। নিজের মতের পক্ষের ভুল তথ্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে দিচ্ছে হাজার হাজার লাইক, শেয়ার; আর অন্যের মতকে অবদমন করতে দিচ্ছে হুমকি, ব্যবহার করছে গালাগাল ও শ্রুতিকটু ভাষা। ডিজিটাল দুনিয়ায় বিরোধী দলের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগের কর্মীরা ব্যর্থ; তারা স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সাথে ছবি তুলে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে ব্যস্ত; তারা শুধু নেতার তোষামদ করে না, নেতার স্ত্রীর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানায়, নেতার মা’র কবর জিয়ারত করে, নেতার বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে কান্নাকাটি করে। আওয়ামী লীগের কর্মীদের প্রধান লক্ষ্য বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটিতে পদ ভাগানো; স্থানীয় নেতার নজরে আসার অভিপ্রায়ে নেতার মা-বাবা, ভাই-বোন, শ্যালক-শ্যালিকা ও স্ত্রীর এমন সব গুণগান করে যা কৌতুক সৃষ্টি করে।
আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে, শুধু উন্নয়ন দিয়ে ভোটারদের প্রীত করা যায় না, নির্বাচনে অনেক অনুষঙ্গের যোগবিয়োগ হয়। বিরোধী দল আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। নির্বাচন যত নিকটবর্তী হবে, নানা প্রান্ত থেকে তত দাবি উঠতে থাকবে। সম্ভাব্য নানা প্রেসার মোকাবিলায় আওয়ামী লীগেরও নিশ্চয় নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা, বিএনপি’র ফখরুল ইসলাম ছাড়া আর কোন নেতার ইমেজ ফুল-ফলে পল্লবিত নয়। ওবায়দুল কাদের সাহেবের কথিত ‘কোমর ভাঙা’ বিএনপি-কে আন্দোলন বা নির্বাচনে হারাতে হলে আওয়ামী লীগের দলীয় কাঠামোর শিরদাঁড় আরও শক্ত করা দরকার।