পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাসের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাংকের মধ্যে এই ঋণচুক্তি সই হয়েছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক টাকা দিচ্ছে, বন্যার প্রকোপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, অর্থ দিচ্ছে দেশকে সবুজ করার নিমিত্তে জলবায়ুসহনশীল উন্নয়ন প্রকল্পে, অর্থ দেবে ক্ষুদ্রশিল্প সেক্টরকে দূষণমুক্ত খাতে রূপান্তর করতে, ঋণ সহায়তা দেবে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে পরিবেশবান্ধব সবুজ বিনিয়োগে। এমন ঋণ বাংলাদেশ নতুন নিচ্ছে না, অতীতে বহুবার নিয়েছে; কিন্তু এবার বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ থেকে ঋণ পাওয়াটা শেখ হাসিনা সরকারের গ্রহণযোগ্যতার বড় স্বীকৃতি। কারণ বিশ্বমন্দার কবলে পড়ে কতগুলো দেশ ইতোমধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেছে, আরও কিছু দেশের দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে; এই অবস্থায় কম সুদহারের ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী করতে সমর্থ হলো।
বিরোধী দল বিএনপি বলছে, শেখ হাসিনার এবারের বিদেশ সফর ব্যর্থ, এই সফরে কোন অর্জন নেই। শেখ হাসিনার সফর ব্যর্থ হলে তা বাংলাদেশের জন্যও দুঃখজনক। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, তিনি বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই তার ব্যর্থতা মানে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব প্রদানে তার ব্যর্থতা। বিদেশে শেখ হাসিনা মূল্যায়িত না হলে বিএনপি’র উল্লাস করার সমূহ কারণ রয়েছে; কারণ এটা গণতান্ত্রিক রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। ক্ষমতাসীন সরকারের ব্যর্থতার তথ্য নিয়ে বিরোধী দল প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে একই আচরণ করত। ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের জন্য জো বাইডেনকে দায়ী করছেন। অসত্য হলেও এমন প্রচারণা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য; তবে সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণ করতে গিয়ে নিজের দেশকে অপমানিত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
আমেরিকা ইচ্ছে করলে যেকোনো দেশের সরকারকে উৎখাত করে তাদের পছন্দমতো সরকারকে বসাতে পারে— সংসদে এমন বক্তব্য দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমেরিকার নিকট ক্ষমা চাওয়া চাইতে হবে কি না— আমেরিকার মুখপাত্রকে এই প্রশ্নটি বারবার করেছেন বাংলাদেশের প্রশ্নকর্তা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গণমাধ্যম শাখার সাবেক সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে সংসদ বলেছেন যে, আমেরিকা ইচ্ছে করলে যেকোনো দেশের সরকারকে উৎখাত করে তাদের পছন্দ অনুযায়ী অন্য কোন সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে পারে। এটা সত্য কথন। মোহাম্মদ মোরসি ছিলেন মিশরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট, নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ২০১৩ সনে মিশরের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করল, আর আমেরিকা সেই ক্ষমতা দখলকে সমর্থন দিল। ২০০৬ সনের নির্বাচনে হামাস জয়ী হয় এবং কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণে তারা ফিলিস্তিনের শাসনক্ষমতায় বসতে পারল না, ফাতাহ দল পরাজিত হয়েও ক্ষমতায় থেকে গেল। সামরিক শাসক মানুয়েল নরিয়েগাকে ১৯৮৯ সনে পানামায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আমেরিকা ধরে নিয়ে যায়। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও তার ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে আমেরিকাকে দোষারোপ করেছেন। আমেরিকার কথা না শুনলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সরানোর ক্ষেত্রেও আমেরিকা কসুর করে না, তাদের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ষড়যন্ত্র পাকাতে থাকে। সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে অতীতে বহু সরকারের মর্মান্তিক পতন হয়েছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সত্য কথা বলার সাহস দেখানো ঠিক হয়েছে কি না তা এই মুহূর্তে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমা চাইতে হলে তা শেখ হাসিনার চেয়ে বাংলাদেশের অপমান হবে বেশি। শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যথা নেই, মাথাব্যথা হচ্ছে খালেদা জিয়ার গণমাধ্যম শাখার সাবেক সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারির। আমেরিকার মুখপাত্র প্রশ্নটির উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও মুশফিকুল ফজল ছিলেন নাছোড়বান্দা। মুশফিকুল ফজলের এমন একগুঁয়েমি দেখে মার্কিন মুখপাত্র বাধ্য হয়ে অন্য সাংবাদিককে ফ্লোর দিয়ে দেন। মুশফিকুল সাহেব ভালো করেই জানেন, গরিব দেশের এমন দু-একটি সত্য কথায় আমেরিকা গোস্বা করে না, গোস্বা করে আমেরিকার বিরুদ্ধে বারবার অবস্থান নিলে। হয় আমেরিকার পক্ষ, নতুবা আমেরিকার শত্রু— এই নীতি আমেরিকা অনুসরণ করে থাকে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সাথে তাদের ৫০ বছরের সম্পর্ক উদযাপন করেছে জাঁকজমকপূর্ণভাবে এবং সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট এইচ ই ডেভিড ম্যালপাসের আমন্ত্রণে সেই উদযাপনে অংশ নেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় বাংলাদেশ উন্নয়ন-লক্ষ্য অর্জনে ধারণার চেয়েও বেশি সফলতা পেয়েছে। বিগত ৫০ বছরে শুধু ২০১২ সনে একবার পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। পদ্মা সেতু নির্মাণে
বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল, দুর্নীতির অভিযোগ দিয়ে এই ঋণ পরবর্তীতে তারা বাতিল করে দেয়। বিশ্বব্যাংকের উত্থাপিত অভিযোগ পরে আর প্রমাণিত হয়নি; কারণ বিশ্বব্যাংক কোন টাকা না দিয়েই দুর্নীতির অভিযোগ দিয়েছিল। অনেকের ধারণা, নোবেলবিজয়ী ড. ইউনূসের সাথে সরকারের সম্পর্কের অবনতি হলে আমেরিকার প্ররোচনায় বিশ্বব্যাংক ঋণ বাতিল করে। এই অবস্থায় নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থের যোগান দিয়ে বাংলাদেশ পদ্মা নদীর উপর সড়কসেতু নির্মাণ করে এবং সেই সেতুর ছবি উপহার দিয়ে শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। বিশ্বব্যাংকও তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে বলে মনে হয়, নতুবা ঋণ প্রদানে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতি এত বেশি নমনীয় হতো না। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট।
বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের ৫০ বছরের সম্পর্ক নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠান শেষে শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্য ও কমনওয়েলথ দেশের রাজা ও রানির রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আপনি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমি আপনাকে অনেক বছর ধরে অনুসরণ করছি। আপনি একজন সফল অর্থনৈতিক নেতা’। যে দেশ আমাদের শাসন করেছে দুইশত বছর সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে শুধু শেখ হাসিনা নন, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরাও আনন্দিত ও গর্বিত। ঋষি সুনাকের এটা কোন রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, কারণ রাজনৈতিক বক্তব্য হলে বলতেন না যে, সুনাক নিজে এবং তার স্ত্রী-কন্যারা শেখ হাসিনাকে ফলো করেন; বলতেন না যে, ঋষি সুনাকের দুই মেয়ে বড় হয়ে শেখ হাসিনা হতে চায়।
শেখ হাসিনার সফর সফল কি না সে বিচার এই লেখায় করব না, তবে তার এই সফর থেকেই জানা গেল, ব্রিটেনের নতুন প্রজন্ম শেখ হাসিনার ভক্ত এবং তাদের জীবনের লক্ষ্য শেখ হাসিনা হওয়া।