যুক্তরাষ্ট্রের সিলভারগেট, সিলিকন ভ্যালি এবং সিগনেচার ব্যাংক— এই তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে দেউলিয়া হয়ে গেছে। এমন বিপর্যয় ইউরোপেও দেখা দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট সুইস ব্যাংক, এই ব্যাংকের সর্বোচ্চ শেয়ারহোল্ডার সৌদি ন্যাশনাল ব্যাংক নতুন তহবিলের যোগান দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এই ব্যাংকের শেয়ারের দরে ৩০ শতাংশ পতন ঘটে। ১৮৫৬ সনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ক্রেডিট সুইস ব্যাংক। দুর্বল ও ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকের আয় দিন দিন কমছিল। সৌদি ন্যাশনাল ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, তারা সুইস ব্যাংকের শেয়ারে আর বিনিয়োগ করবে না। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের ভরসা দিচ্ছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক এবং সুইস ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট সুপারভাইজরি অথরিটি প্রয়োজনে ক্রেডিট সুইসকে আর্থিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।
হঠাৎ ব্যাপকভাবে আমানত তুলে নেওয়ার কারণে উল্লেখিত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে এসেছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহক তাদের ব্যাংক হিসাবে রাখা সঞ্চয়ের অর্থ তুলে নেওয়ায় ধসে পড়ে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই মার্কিন সিগনেচার ব্যাংকও দেউলিয়া হয়ে যায়। তারল্য সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করায় ফেডারেল ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশন সিগনেচার ব্যাংক বন্ধ করে দেয়। ব্যাংকগুলোর পতনের পরপর ডলারের দর কমেছে এবং জ্বালানি তেলের দর বেড়েছে ৩০ শতাংশ।
২০০৭ সনেও ‘সাব প্রাইম’ লোনের কারণে আমেরিকায় ব্যাংকিং খাতে ধস নেমেছিল। বাছবিচার না করে বাড়ি ক্রয়ের জন্য ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলো বিপদে পড়েছিল। পশ্চিমের দেশগুলোতে ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি ক্রয় করা অপেক্ষাকৃত সহজ। গৃহীত ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা নেই এমন ব্যক্তিকেও তখন ঋণ দেওয়া হয়েছিল। ঋণ সহজলভ্য ও ঋণের শর্ত সহজ হওয়ায় কোন কোন ব্যক্তি ঋণের টাকায় একাধিক বাড়ি ক্রয় করে, কিন্তু ক্রীত বাড়ির বাজারমূল্য হঠাৎ কমে যাওয়ায় ঋণের টাকা আর ফেরত আসেনি। ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আমেরিকান সরকার তখন ব্যাংকগুলোকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ধার দিয়েছিল। আমেরিকায় সংঘটিত এই বিপর্যয় তখন পৃথিবীর সর্বত্র প্রতিফলিত হয়েছিল। আইএমএফ-এর পরামর্শ না শুনে নিজস্ব পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ার ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করে মাহাথির মুহাম্মদ তখন সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছিলেন। ব্যাংকিং খাতে এমন বিপর্যয়ের জন্য অদক্ষ ব্যাংকারদের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার দায় আমেরিকান জনগণ তখন নিতে চায়নি, বাজেট কাটছাঁট করে ব্যাংকগুলোকে জনগণের অর্থ দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিল তারা, তারা চেয়েছিল দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকারদের কঠোর শাস্তি।
২০১১ সনে ‘অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট মুভমেন্ট’-এর কথা আমাদের মনে থাকার কথা। নিউইয়র্ক টাইমস স্কয়ারে ‘অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট’ আন্দোলনের শুরু হলেও তা ছড়িয়ে পড়েছিল প্রায় সারা বিশ্বে। যারা আন্দোলন করছিল তাদের মুখে একটি কথাই সমস্বরে উচ্চারিত হয়েছে এবং তা হলো, বিশ্বের মাত্র এক শতাংশ মানুষ বিশ্বের ৯৯ শতাংশ সম্পদ ভোগ করছে। তাদের অভিমত ছিল, সমাজে এমন বৈষম্য সৃষ্টির পেছনে ব্যাংকগুলোর পক্ষপাতমূলক আচরণ দায়ী। তখন তারা ব্যাংক-বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্বের অবসান চেয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের ঘৃণার লক্ষ্যবস্তু ছিল ব্যাংক, বিভিন্ন দেশের ব্যাংকের উপর এরা ক্ষুব্ধ হয়ে ডিম ছুঁড়েছিল। তাদের মতে ব্যাংকগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত, ব্যাংকগুলো মুনাফা লুটে সিদ্ধহস্ত। ‘অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট’ আন্দোলনের বক্তব্য ছিল, ব্যাংকগুলো হচ্ছে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টির হাতিয়ার, ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখে না, স্বার্থ দেখে বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের, তাদের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা। চোর-বাটপার, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, লুটেরা ব্যবসায়ী সবার টাকা-পয়সা থাকে ব্যাংকে; এখানে লুটেরাদের তথ্য থাকে গোপনীয়, এই সকল আর্থিক অব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন মনিটরিং থাকে নেই।
তারল্য সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকেও অবসায়ন করতে হয়েছিল। নব্বই দশকের শুরুতে আমি নিজেই কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নওগাঁ শাখাটির কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছিলাম। সবল ও শক্তিশালী বেসিক ব্যাংকও দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল শুধু মনিটরিং কর্তৃপক্ষের প্রশ্রয় আর ব্যাংকের ব্যবস্থাপকদের অদক্ষতার কারণে। চোরাকারবারির সাথে জড়িত থাকায় ১৯৯২ সনে ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনালকে বিলুপ্ত করে গড়ে তোলা হয় ইস্টার্ন ব্যাংক। শুধু দুর্নীতির কারণে ২০০৬ সনে ধস নেমেছিল ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের। ফারমার্স ব্যাংকের নাম হয়েছে পদ্মা ব্যাংক, এই ব্যাংকটিকে বাঁচাতে রাষ্ট্র-মালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ মূলধন জোগান দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নমনীয় ও দুর্বল মনিটরিং-এর কারণে পি কে হালদার নামের এক দুর্বৃত্ত কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া করে দিতে সমর্থ হয়েছে।
আমাদের দেশে যে কোন মূল্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি বিভাগের নাম ছিল ‘প্রবলেম ব্যাংক’। সমস্যা-কবলিত ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার নানা নিয়ম-নীতি, কলাকৌশল সৃষ্টি করা হতো এই বিভাগ থেকে। আমি এই বিভাগে কাজ করার সুবাদে সিঙ্গাপুরে আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করে প্রবলেম ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার নানা কৌশল ব্যাখ্যা করেছিলাম। বাজার অর্থনীতিতে এভাবে কোন প্রতিষ্ঠানকে জোর করে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার ঘোর বিরোধী পশ্চিমা বিশ্ব। বীমার মাধ্যমে আমানতের অর্থ সুরক্ষিত থাকে বিধায় আমেরিকায় দু-একটি ব্যাংকের ধসে কোন সমস্যার সৃষ্টি হয় না। কিন্তু আমাদের মতো দেশে কোন একটি ব্যাংকে ধস নামলে গোটা ব্যাংকিং খাতে ধস নামার সম্ভাবনা থাকে। কারণ বিশ্বাস ও আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে সকল আমানত একযোগে উত্তোলন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে কিছুদিন আগে গুজব ছড়িয়ে ব্যাংকিং জগতে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল, ইসলামি ব্যাংকের ক্ষেত্রে কিছুটা ফলপ্রসূ হলেও অপরাপর ব্যাংকে তেমন প্রভাব পড়েনি। তবে একটি কথা সত্যি যে, আমাদের দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত নিয়ে ইতিবাচক কথা বলার সুযোগ খুব কম।
খেলাপি ঋণের মধ্যে ‘কুঋণ’ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা। এর প্রধান কারণ ব্যাংকের অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং লুটেরা ব্যবসায়ীর অর্থ পাচার। খেলাপি ঋণের জন্য হাজার হাজার মামলা কয়েক যুগ ধরে ঝুলছে, মামলা হলেই অসৎ ও অদক্ষ ব্যবস্থাপকদের নিষ্কৃতি লাভের দরজা খুলে যায়। ঋণ পরিশোধ না করার লক্ষ্যে দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীরা উচ্চতর আদালতে রুজু করে দেয় রিট। ব্যবসায়ীরা ঋণের টাকা পরিশোধ না করে পুনঃতফসিলের সুযোগ নেয়। প্রায় প্রতিটি ব্যবসায়িক লোনের সাথে দুর্নীতি জড়িত থাকে বিধায় ব্যবসায়ীরা একবার লোন নিয়ে তা আর ফেরত দিতে চায় না, ফেরত দিয়ে আবার লোন নিতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। লোন প্রদানে গড়িমসি ছাড়াও বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের কথা ব্যবসায়ীরা খোশগল্পে উচ্চারণ করে থাকেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে পরিদর্শন ও মনিটরিং-এ বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলার কথা আদালতও বহুবার বলেছে।
নোবেল পাওয়ার আগেই গরিব কৃষক, শ্রমিক ও মৎস্যজীবীদের মহাজনী ঋণ থেকে বের করে আনার জন্য ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ জমিদারি এলাকা পতিসরে 'কালীগ্রাম কৃষি সমবায় ব্যাংক' স্থাপন করেছিলেন। সুস্থ সমবায় ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করে খেটে খাওয়া মানুষের জন্য তিনি স্বল্প সুদে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করে ভেবেছিলেন, প্রান্তিক মানুষের জীবনব্যবস্থা বদলে যাবে। ক্ষুদ্রঋণের আইডিয়াটা রবীন্দ্রনাথের মনেই সম্ভবত প্রথম উদয় হয়েছিল; কিন্তু ফলাফল হয়েছিল ভয়াবহ, ঋণ নিয়ে অনেকেই ফেরত দেয়নি। ধস ঠেকাতে ১৯১৩ সনে পাওয়া নোবেল পুরস্কারের ১ লাখ ২০ হাজার টাকাও সেই ব্যাংকে লগ্নি করেছিলেন। ১৯২৫ সনে রবীন্দ্রনাথের এই ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়। ব্যাংক দেউলিয়া হলে ভোগান্তি হয় আমানতকারীর, তাদের আমানতের টাকা আটকে যায়। আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়া নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি আমানত বীমা তহবিল গঠন করা হয়েছিল, এখনো তা আছে কি না তা আমার জানা নেই। ১৯৯৯-২০০০ সনে এই তহবিলের মনিটরিং করার দায়িত্ব পালন করেছি। প্রতিটি ব্যাংক তাদের মোট আমানতের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়মিত এই তহবিলে জমা রাখার কথা।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত হচ্ছে বিশ্বাস ও আস্থা। তাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অসৎ এবং অদক্ষ লোকদের সমাবেশ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং-এর দুর্বলতা আদালতের চোখেও ধরা পড়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির উন্নত দেশগুলোতে ব্যাংক নিয়মিতই দেউলিয়া হচ্ছে, আমানত সুরক্ষার বিধান মজবুত বিধায় দু-একটি ব্যাংকের দেউলিয়াত্ব দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে না; কিন্তু আমাদের দুর্বল অর্থনীতিতে ব্যাংকের উপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখা জরুরি, নতুবা ব্যাংকিং খাতে ধস নামার সাথে সাথে দেশের অর্থনীতিতেও ধস নামবে।