বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীন পরস্পর বিশ্বস্ত সহযোগী। দিন দিন এই সহযোগিতা সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতিতে চীন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। পদ্মা সেতুসহ দেশের অনেকগুলো বড় সেতু, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি, বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ প্রকল্প, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টার, কর্ণফুলী টানেল ইত্যাদি খাতে চীনের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশ এখন চীনের একচেটিয়া বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সকল আমদানির উৎস হলো চীন। চীন থেকে বাংলাদেশের ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্যসামগ্রী আমদানির বিপরীতে চীন মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্যসামগ্রী বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে। চীন থেকে ভারতের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পণ্য আমদানি করে থাকে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে চীনের জন্য পৃথক একটি অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা হয়েছে। চীনের সামরিক অস্ত্র দিয়েই আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সুসজ্জিত। চীন থেকে সংগৃহীত দুইটি সাবমেরিন বাংলাদেশ নৌবাহিনী বর্তমানে ব্যবহার করছে। অদূর ভবিষ্যতে চীনের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বর্তমানে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক অতি চমৎকার। বাংলাদেশ এখন চীনের বিশ্বস্ত বন্ধুও। বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালায় বলা হয়, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক অনেক পুরাতন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নাকি ঐতিহাসিক সম্পর্কও বিদ্যমান। আমরাও তাইওয়ান ও তিব্বতের প্রশ্নে এক চীন নীতিতে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি, তাইওয়ানকে আমরা চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করি। চীনপন্থী রাজনীতিবিদদের অভিমত হচ্ছে, চীন কখনো কোন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। অথচ ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চীন পাকিস্তানের পক্ষে এবং বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। চীন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিল, চীনের অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালিদের গুলি করে মেরেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর বহু দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও ১৯৭৫ সন পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে চীন এত বেশি বিরোধী ছিল যে, বঙ্গবন্ধু যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি, বঙ্গবন্ধুকে খুন করার পর ১৯৭৬ সনের জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল, বাংলাদেশ যাতে জাতিসংঘের সদস্য হতে না পারে সেজন্য চীন কয়েকবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।

আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে বলে কিছুদিন আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। অথচ এই সমর্থনের প্রয়োজন ছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়। সমাজতান্ত্রিক চীনের অবস্থান যদি নির্যাতনের বিরুদ্ধে হয়, ন্যায়ের পক্ষে থাকে তাহলে চীনের অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা এত নির্মমভাবে বাঙ্গালী নিধনে সাহস পাওয়ার কথা ছিল না। পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর উপর যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছিল তা বন্ধ করতে চীন কোন ভূমিকাই পালন করেনি। নারীদের উপর পাকিস্তানি সেনাদের পাশবিক নির্যাতন আর ধর্ষণের বিরুদ্ধে সৌদি আরবও কোন প্রতিবাদ করেনি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠনেও চীন কোন সহায়তা দেয়নি। শুধু চীনের বিরোধিতার জন্য ১৯৭৪ সন পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সৌদি আরব, আমেরিকা এবং চীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, তারা চায়নি বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। ১৯৭১ সনে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে এই দুইটি দেশ এক হয়ে স্বীকৃতি দিয়েছিল পাকিস্তানের নৃশংস গণহত্যার। চীন এবং আমেরিকা আমাদের মুক্তিকামী মানুষগুলোকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে আখ্যা দিয়েছিল।

আমাদের স্বাধীনতার মাস মার্চ, এই মার্চ মাসে ৫২তম স্বাধীনতা দিবসের উৎসবে আমরা হয়তো বলব, চীন আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। কিন্তু এই পরীক্ষা কবে কখন কোথায় দিয়েছে তা কেউ বলব না। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরীক্ষা দিয়েছে ভারত এবং রাশিয়া। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে সারা পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছিলেন তখন ভারতকে সমর্থন যুগিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়ন

সমর্থন না যোগালে ভারতের পক্ষে শক্তিশালী আমেরিকা এবং চীনের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না। ভারত শুধু এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়নি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যুদ্ধ করার জন্য হাতিয়ারও দিয়েছে। স্বাধীনতার মাস মার্চে তাই চীন নয়, অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে ভারত এবং রাশিয়ার নাম উচ্চারিত হোক।

ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে আমরা রাশিয়াকে সমর্থন করতে পারছি না। পারা সম্ভবও নয়, আমেরিকার কোপানলে পড়লে এখন রাশিয়াও আর আমাদের উদ্ধার করতে পারবে না; তাই আমরা নিরপেক্ষ থাকার ভান করছি। অথচ একাত্তরে আমেরিকা এবং চীন প্রকাশ্যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। চীন এবং আমেরিকা যখন বুঝতে পারল যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অবশ্যম্ভাবী তখন তারা পাকিস্তানের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উত্থাপন করে; স্বাধীনতা অর্জনে বাধা সৃষ্টির এই অপপ্রয়াসে রাশিয়ার ভেটো প্রয়োগ না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো কি না সন্দেহ। একই প্রস্তাব আরও দুইবার উপস্থাপন করা হয়, রাশিয়া প্রতিবারই ভেটো দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য আমেরিকা থেকে ভারত মহাসাগর অভিমুখে সপ্তম নৌবহর পাঠানো হয়। সপ্তম নৌবহর আগমনের সংবাদ পাওয়ার পরপর পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধরত পাকিস্তানি সেনারা উজ্জীবিত হয়ে উঠে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে তাদের ১৫টি যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করলে পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল একেবারেই ভেঙে যায় এবং উপায়ন্তর না দেখে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

যুদ্ধোত্তর স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট পুনর্নির্মাণে ভারত এবং রাশিয়ার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকা উচিত। আমাদের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে অসংখ্য জাহাজ মুক্তিযোদ্ধারা ডুবিয়ে দিয়েছিল, বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করার জন্য পানির নিচে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজগুলোর অপসারণ জরুরি ছিল। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তানের নৌবাহিনী বন্দরগুলোর পানির নিচে মাইন পেতে রেখেছিল যাতে বাংলাদেশে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে কোনো জাহাজ বন্দরে নোঙর করতে না পারে। চট্টগ্রাম বন্দর এবং কর্ণফুলী নদী থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর পোঁতা মাইন এবং যুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া জাহাজ অপসারণ করতে সহযোগিতা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এই কাজে তাদের ১৮ জন নাবিকের মৃত্যু হয়, এর মধ্যে ১৭ জনের মৃতদেহের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ১০-১৪ হাজার ভারতীয় সেনা জীবন দিয়েছে।

১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিবর্তে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রমুখী হয়ে উঠে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ঘোর বিরোধী চীন এবং আমেরিকার প্রতি যে অনুকূল মনোভাব গড়ে উঠে তা অর্থনৈতিক কারণে পরবর্তীকালে আরও সুদৃঢ় হয়েছে। চীন প্রচুর উদ্বৃত্ত অর্থের মালিক, তারা সুযোগ পেলেই বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিও গত কয়েক দশকে অনেক উন্নতি করেছে, উন্নয়নের এই গতি অনবচ্ছিন্ন রাখার স্বার্থে চীনের বিনিয়োগ অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। ঠিক তদ্রূপ আমেরিকার প্রভাবের বাইরে থাকার ক্ষমতাও বাংলাদেশের নেই। আমেরিকা ইতোমধ্যে রাশিয়া এবং চীনকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার চাপে পড়ে চীন তাদের উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের পোশাক রপ্তানি নির্ভর করছে আমেরিকা এবং ইউরোপের মর্জির উপর।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধীরা শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে এবং ইত্যবসরে তারা এত বেশি শক্তি অর্জন করে ফেলেছে যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানের বৈমাত্রীয়সুলভ আচরণকে ঢাকা দিয়ে তারা স্বাধীনতার সাথে রাশিয়া-ভারতের নিজস্ব স্বার্থকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে সমর্থ হয়েছে; তারা বুক উঁচু করে শ্লোগান দিচ্ছে ‘রুশ-ভারতের দালালেরা— হুঁশিয়ার, সাবধান’। কতিপয় রাজনৈতিক দল আমেরিকা বা চীনের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে একটি কথাও উচ্চারণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো স্লোগান দেয়নি। স্বাধীনতার স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে বিকৃত করে ব্যঙ্গ করে পিনাকী ভট্টাচার্য যেভাবে কথা বলেন তা জাতির জন্য দেশের জন্য অপমানজনক। সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তিনি মতামত প্রকাশ করতেই পারেন, কিন্তু ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের বিরুদ্ধে তার এমন কুৎসিত মনোভঙ্গির প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। স্বাধীনতা বাঙ্গালী জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন, আওয়ামী লীগ বিরোধিতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা এক নয়— এই কথাটি বুঝিয়ে দেওয়ার সাহসও আমরা হারিয়ে ফেলেছি।