৩ মার্চ, ২০২৩; কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের আরেকটি দিন। পঞ্চগড় শহরে বাংলাদেশের কাদিয়ানিদের উদ্যোগে আয়োজিত একটি জলসা বন্ধের দাবিতে শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মুসল্লিরা দল বেঁধে জলসার দিকে যাওয়ার পথে পুলিশ বাধা দেয়; বেঁধে যায় সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে দুইজন মারা গেছে এবং আহত হয়েছে শতাধিক, আহতদের মধ্যে ৩০ জন পুলিশ। যে দুইজন মারা গেছে তাদের মধ্যে একজন কাদিয়ানি, তাকে জবাই করে বা পিটিয়ে মারা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম। অন্যজন শিবিরকর্মী, পুলিশের গুলিতে বা সংঘর্ষে মারা গেছে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চার ঘণ্টাব্যাপী চালানো তাণ্ডবে কাদিয়ানিদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে, দোকানপাট, সহায়-সম্পত্তি লুট করা হয়েছে। সুন্নি মুসল্লিদের আক্রমণে কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

কাদিয়ানিরা প্রতি বছর পঞ্চগড়ে তাদের ধর্মীয় জলসা বা সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে এবং প্রায় প্রতি বছরই তাদের সম্মেলন পণ্ড হয়ে যায়। সুন্নি আলেমদের বক্তব্য হচ্ছে কাদিয়ানিরা নিজেদের মুসলমান হিসেবে দাবি করতে পারবে না, কারণ তারা নবী মুহম্মদ (স.)-কে শেষ নবী বলে স্বীকার করে না। কিন্তু কাদিয়ানি জামাতের বক্তব্য অনুযায়ী তাদের নতুন কোন ধর্ম নেই, তারা খাঁটি মুসলমান। তাদের কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ, তারা নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজ পরিপালন করে, তারা কোরআন বিশ্বাস করে, তারা আল্লাহ ও নবী মুহাম্মদ (স.)-কে মানে। কাদিয়ানিরা মনে করে, তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ কালেমায় বিশ্বাস করে বলে তাদের ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করার অধিকার কারো নেই।

অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরের গ্রাম কাদিয়ানে ১৮৩৫ সনে মির্জা গোলাম আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮৮০ সনে দাবি করেন যে, ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ভুল পথে থাকা মুসলমান সমাজকে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য’ তিনি ইসলামের একজন সংস্কারক হিসাবে এসেছেন। কিন্তু ১৮৮৯ সনে তিনি প্রথমবার দাবি করেন যে, তিনি ইসলামের একজন নবী, ধর্মে যে ‘আহমদ’ নবীর কথা বলা হয়েছে তিনি সেই আহমদ নবী। এই কারণে কাদিয়ানিদের আহমদীও বলা হয়। তাদের দাবি মোতাবেক ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী যে ইমাম মাহদী এবং ঈসা নবীর আগমনের কথা রয়েছে মির্জা গোলাম আহমদ হচ্ছেন সেই ইমাম মাহদী এবং ঈসা নবী। কাদিয়ানি বা আহমদীদের সাথে সুন্নি মুসলমানদের প্রধান বিরোধ হচ্ছে প্রতিশ্রুত মাহদী ও ঈসা নবীর আগমন নিয়ে। সুন্নি মুসলমানগণ মনে করেন প্রতিশ্রুত মাহদী আসবেন, কিন্তু এখনো আসেননি। আহমদীদের অন্য বক্তব্য অনুযায়ী মির্জা গোলাম আহমদ পূর্ণাঙ্গ নবী নন, বরং ইসলামের নবী মুহাম্মদ (স.)-এর বাণী প্রতিষ্ঠা করতে তিনি এসেছেন। তাই তার অনুসারীরা তাকে ‘উম্মতি নবী’ বলেও দাবি করেন। ‘উম্মতি নবী’র ধারণা কোরআন ও হাদিস দ্বারা সমর্থিত নয় বিধায় সুন্নি মুসলমান তাদের ইসলামের অন্তর্ভুক্ত করতে নারাজ।

জামায়াতে ইসলাম ও মাওলানা মওদুদী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করায় পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। এই ভাবমূর্তি উদ্ধারে মাওলানা মওদুদী ‘কাদিয়ানি সমস্যা’ নামে একটি বই লিখে কাদিয়ানি বা আহমদীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তোলেন। মওদুদী জানতেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা হলে জনসমর্থন পাওয়া যায়। নিজের ও তার দলের ভাবমূর্তি উদ্ধারে মাওলানা মওদুদী আহমদীদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা ১৯৫৩ সনে মারাত্মক দাঙ্গায় পর্যবসিত হয়, আহমদীদের কচুকাটা করা হয়। মওদুদীকে গ্রেফতার করা হয়। কাদিয়ানিবিরোধী আন্দোলনে তার বা তাদের দলের সংশ্লিষ্টতা ছিল না ঘোষণা দেওয়ার পরও বিচারে মওদুদীকে ফাঁসির দণ্ড প্রদান করা হয়। কাদিয়ানিবিরোধী আন্দোলনে মওদুদী এবং তার দলের সংশ্লিষ্টতা না থাকার মিথ্যাচার করায় আন্দোলনের শরীক অন্য দল ‘খতমে নবুয়াত’ মাওলানা মওদুদীকে ‘ধর্মদ্রোহী’ এবং ‘আল্লাহতে অবিশ্বাসী’ বলে ফতোয়া প্রদান করে।

আহমদিয়া মুসলিম জামাতের অনুসারীরা নিজেদের অন্য সকল মুসলমানের মতোই মুসলিম বলেই দাবি করে। এই সম্প্রদায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, পাকিস্তান হওয়ার পর ভারত থেকে বহু আহমদিয়া পাকিস্তান চলে আসে, তাদের প্রত্যাশা ছিল পাকিস্তানে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে ধর্ম পালন করতে পারবে। কিন্তু আহমদীরা এখন ভারতে নির্বিঘ্নে ধর্ম পালন করতে পারলেও তাদের প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে পারছে না। ধর্মীয় নেতাদের চাপে ১৯৭৪ সনে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সংবিধান সংশোধন করে আহমদীদের ‘অমুসলিম’ বলে ঘোষণা করেন। এক দশক পর আরেকটি আইন করে তাদের মসজিদে নামাজ পড়া বা প্রকাশ্যে ধর্মচর্চা নিষিদ্ধ করা হয়; অথচ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাকালীন অন্যতম নেতা ও প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান এবং পাকিস্তানের নোবেলবিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আব্দুস সালাম ছিলেন আহমদী সম্প্রদায়ের। সৌদি আরবেও তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে; তাদের কেউ হজ করতে গেলে তাকে আটক করা হয় কিংবা দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশসহ অনেক মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে আহমদিয়া জামাতের বিরুদ্ধে একাধিকবার বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু স্পেন থেকে মুসলমানদের ১৪৯২ সনে বিতাড়নের পর সেই দেশে প্রথম মসজিদ স্থাপন করে আহমদীরাই। ভারতের কর্ণাটকে হিজাবের প্রতিবাদ করা শত শত গেরুয়াধারীর সামনে সাহসে দাঁড়িয়ে হিজাব-পরা যে তরুণী ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তুলে মুসলিম বিশ্বের মন জয় করেছিল, সে ছিল একজন কাদিয়ানি বা আহমাদী।

মুসলমানদের মধ্যে ধর্ম নিয়ে, ধর্মের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। নবীজী বলেছেন, ‘বনু ইসরাইল ৭২ ফেরকায় বিভক্ত হয়েছিল, আমার উম্মত ৭৩ ফেরকায় বিভক্ত হবে। সবাই জাহান্নামে যাবে, একটি দল ব্যতীত’। কিন্তু প্রতি ফেরকার লোক মনে করে তারা একমাত্র সঠিক। এক আলেম আরেক আলেমকে শুধু ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিন্নতার জন্য যেভাবে অশ্লীল, নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালি দেয়, যেভাবে পা থেকে জুতা নিয়ে হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতার সম্মুখে প্রতিপক্ষের আলেমকে পিটানোর হুমকি দেয় তা কোন ভব্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। শুধু তাই নয়, এক আলেম আরেক আলেমকে ‘কাফের’, ‘মুরতাদ’ বলে অহরহ ফতোয়া দিচ্ছে। চার মাজহাবের অনুসরণ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন রয়েছে, কিন্তু প্রত্যেকটি মাজহাব দলিলের উপর প্রতিষ্ঠিত।

ইসলামের প্রধান দুইটি ধারা হচ্ছে সুন্নি ইসলাম এবং শিয়া ইসলাম। সুন্নিরা নানাভাবে শিয়াদের কাফের ঘোষণা করেছে, আবার শিয়ারাও সুন্নিদের কাফের ঘোষণা করেছে। কিন্তু দুই পক্ষই নিজেদের ইমান-আকিদাকেই সহিহ ইসলাম বলে গণ্য করে। শিয়াদের মতে, হযরত আলী (রা.) যেই কোরআন সঙ্কলন করেছিলেন সেই কোরআনই বিশুদ্ধ এবং দূষণমুক্ত; কিন্তু খলিফা উসমান (রা.) তা গ্রহণ করেননি। কোরআনের আয়াত সংখ্যা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে প্রচুর মতভেদ আছে। আবু বকর (রা.) যে কোরআন সঙ্কলন করেন তাকে আদি কোরআন বলা হয়; কিন্তু ওসমান (রা.)-এর সঙ্কলিত কোরআনের সাথে আবু বকর (রা.)-এর কোরআনের পার্থক্য লক্ষ্য করে আদি কোরআনটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে যে কোরআনকে আমরা বর্তমানে নিখুঁত ও অবিকৃত হিসেবে গণ্য করে থাকি সেই কোরআনকে আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাসঊদ (রা.) মানেননি। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন এমন সাহাবী যার কাছ থেকে কোরআন শিক্ষা নিতে স্বয়ং নবীজী (স.) বলে গেছেন। হযরত ওসমান (রা.)-এর সময়েও তিনি জীবিত ছিলেন, কিন্তু কোরআন সঙ্কলনে ওসমান (রা.) তাকে ডাকেননি। কোরআন বিকৃত করার অভিযোগে হযরত ওসমান (রা.)-কে মুসলমানেরা নির্মমভাবে হত্যা করেছেন। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর সন্তান মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর (রা.) খলিফা উসমান (রা.)-কে কিতাবুল্লাহ বা কোরআন পরিবর্তনের অভিযোগে অভিযুক্ত করে সর্বপ্রথম দাড়ি ধরে তীরের ভারী ফলা দিয়ে আঘাত করেছিলেন। অথচ আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন, কোরআনের সংরক্ষণ করবেন তিনি নিজে। আল্লাহ যার সংরক্ষক তা বিকৃত করার ক্ষমতা মানুষের নেই।

সহি মুসলমান প্রকৃতপক্ষে কে বা কারা তার সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৫৩ সনে আহমদীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত দাঙ্গার তদন্ত করতে পাকিস্তান সরকার দুইজন বিচারপতিকে নিয়ে যে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল সেই কমিশন বিখ্যাত বিখ্যাত আলেমদের প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিল, ‘মুসলমান কারা?’ এই কমিশন তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, ওলামাদের একজনের সংজ্ঞা অনুসারে মুসলমানের সংজ্ঞা মেনে নেওয়া হলে বাকি ওলামাদের অমুসলমান আখ্যা দিতে হয়। এভাবে এক তরিকার মুসলমান অন্য তরিকার মুসলমানদের বাতিল করে দিলে পৃথিবীতে প্রকৃত মুসলমানের সংখ্যা শূন্যে নেমে আসবে, দুইশত কোটি মুসলমানের সংখ্যা নিয়ে অহংকার করার সুযোগ থাকবে না। তাই আহমদিয়াদের ‘অমুসলিম’ আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যা, তাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, তাদের সম্পদ লুট করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তা আলেমেরাই পুনর্মূল্যায়ন করুক।