পনের দিন অপেক্ষা করেও ভারত সরকারের অনুমতি না পেয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জাম খালাস না করেই ভারতের জলসীমা ত্যাগ করেছে রুশ জাহাজ ‘উরসা মেজর’। ‘স্পার্টা ৩’ নামের সমুদ্রগামী জাহাজের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাশিয়া সেই জাহাজের নাম ও রঙ পাল্টে ‘উরসা মেজর’ নামকরণ করে এবং সেই জাহাজে করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পণ্য নিয়ে এলে জাহাজটিকে মোংলা বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া বন্দরে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনীত পণ্য খালাসের কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা জয়ী হলো, ভারতও বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়ার চেয়ে আমেরিকাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। আমেরিকার বিরোধিতা করে বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকা খুব সহজ নয়। জাহাজটির পণ্য বাংলাদেশ বা ভারতের কোন বন্দরে খালাস করা হলে বাংলাদেশ বা ভারতের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা তৈরি হতো।

বাংলাদেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মূলত তেল-গ্যাস-কয়লার উপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লার মজুদ খুবই সীমিত। ফলশ্রুতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত তরল পেট্রোলিয়ামের উপর আমাদের বহুলাংশে নির্ভর করতে হয়; নির্ভর করতে হয় বলেই উচ্চমূল্যের জ্বালানি তেল-গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে তেল-গ্যাসের উপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে। রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে ইউরেনিয়াম। চলতি বছরের শেষ দিকে এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু পণ্য খালাসে জটিলতার কারণে রূপপুর প্রকল্প বিলম্বিত হবে। ‘উরসা মেজর’ জাহাজের পরিবর্তে অন্য আরেকটি জাহাজে করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জামাদি বাংলাদেশে পাঠানো হবে বলে রাশিয়া বাংলাদেশকে নিশ্চিত করলেও পুনরায় রাশিয়া থেকে পাঠাতে কিছুটা সময় নষ্ট হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যর্থতা বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিক ঘটনা; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হলে তাকে বিরাট অর্জন বলে মনে করা হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাম্প্রতিককালে গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ।

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার বা শান্তি স্থাপনের কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ ইউক্রেনের যে চারটি অঞ্চলকে রুশ ফেডারেশনের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে সেই চারটি অঞ্চল রাশিয়া ছাড়লে পুতিনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার জনগণের বিদ্রোহ অনিবার্য। এত ক্ষয়ক্ষতির পর পশ্চিমা শক্তির কাছে বশ্যতা স্বীকার করা হলে রাশিয়ার রাজনৈতিক মৃত্যু হবে। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া সম্পূর্ণ ইউক্রেন দখল করে নিজেদের পছন্দমতো কাউকে প্রেসিডেন্ট পদে বসিয়ে দিতে পারে। তাও খুব সহজ হবে না; কারণ আমেরিকা ও ইউরোপ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সর্বাধুনিক অস্ত্র ইউক্রেনকে দিচ্ছে। ইউক্রেনের সেনাদের মনোবল অটুট থাকলে যুদ্ধ চলতেই থাকবে, কারণ রাশিয়াকে স্থায়ীভাবে ব্যতিব্যস্ত রাখাই আমেরিকার উদ্দেশ্য। আমেরিকা রাশিয়ার পরাজয় দেখতে আগ্রহী। আমেরিকা পৃথিবীতে তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চায় না। চীনের ব্যবসা-বাণিজ্যের উপরও আমেরিকা নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং তা শুরু হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমল থেকেই।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশ সফর করেছেন। তার সফর নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় মিডিয়াজগত সরগরম। রুশ জাহাজটির পণ্য কলকাতার হলদিয়া বন্দরে খালাস করার ব্যাপারে সম্ভবত ভারতের সম্মতি ছিল, কিন্তু ডোনাল্ড লুর বার্তা পেয়ে ভারত পরে আর রাজী হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি পরিচালিত হয় তার নিজস্ব স্বার্থকেন্দ্রিক, এক্ষেত্রে তারা বন্ধুত্ব বা শত্রুতাকে স্থায়ী হিসেবে বিবেচনা করে না। চীনের বিরুদ্ধে ভারত হচ্ছে আমেরিকার অস্ত্র। শুধু সীমান্ত বিরোধ নয়, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়েও চীন এবং ভারতের মধ্য প্রতিযোগিতা হচ্ছে। পাকিস্তানের সাথে ভারতের শত্রুতা জন্মলগ্ন থেকেই। পাকিস্তানের সাথে চীনের বন্ধুত্ব গাঢ়। চীনের কাছে রয়েছে অঢেল সম্পদ; শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, বাংলাদেশে চীন নিরবচ্ছিন্নভাবে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। এই সকল দেশের সরকারের সাথেও চীনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে কোন দেশের উপর ভারত বা চীনের প্রভাব বেশি তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির উপর। মালদ্বীপের বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো, কিন্তু অব্যবহিত পূর্ববর্তী সরকারের সাথে চীনের সম্পর্ক ছিল গভীর। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার চীন এবং ভারত উভয় দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হলেও নৈকট্য বেশি ভারতের সাথে। অবশ্য বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তার উল্টাটা হয়। আমেরিকা চীনকে চাপে রাখতে ভারতকে হাতে রাখতে চায়। ভারত তা জানে, জানে বলেই তারা রাশিয়ার সাথেও সুসম্পর্ক রাখতে সমর্থ হয়েছে, এই ক্ষেত্রে আমেরিকা ভারতকে খুব বেশি ঘাঁটায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার অতিপ্রয়োগের কারণে বিশ্বে নতুন মেরুকরণের উদ্ভব হচ্ছে। যে সকল দেশের উপর আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে সেই সকল দেশ পরস্পর পরস্পরের নিকটে আসার চেষ্টা করছে। কিউবা, উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমার, ভেনিজুয়ালা, ইরান, চীন, রাশিয়া, কম্বোডিয়া, আফগানিস্তান, সিরিয়া প্রভৃতি দেশের উপর আমেরিকা নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। এই সকল দেশকে নানা নিষেধাজ্ঞায় তারা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। রাশিয়া এক সময় চীন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলত; কিন্তু চীন এবং রাশিয়া উভয় দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ভ্লাদিমির পুতিন তার কৌশলগত মিত্র হিসেবে চীনকে বেছে নিয়েছেন। এই সকল নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আমাদের মতো গরিব দেশগুলোকেও নাকানিচুবানি খাচ্ছে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিউবায় চটের বস্তা বিক্রি করায় আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য প্রেরিত গমের জাহাজ সমুদ্রের মাঝপথ থেকে ফেরত নিয়ে যায়, এর মাধ্যমে আমেরিকা ১৯৭৪ সনে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিল। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে না পারায় উজবেকিস্তান থেকে আমরা কম পয়সায় তুলা আনতে পারি না। উজবেকিস্তানের নিজস্ব সমুদ্রবন্দর নেই, তারা ইরান এবং রাশিয়ার বন্দর ব্যবহার করে থাকে। গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদের সময় সংকট মোকাবিলায় দুই টাকার কারেন্সিনোটের কাগজ উজবেকিস্তান থেকে আনতে হয়েছিল কার্গো বিমানে করে।

বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো এখন জনগণের চেয়ে আমেরিকাকে বেশি বিশ্বাস করে। ইদানীং বাংলাদেশের কিছু লোক বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগ বিরোধী তারা আমেরিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমেরিকার প্রশংসায় শুধু বিএনপি বা জামায়াত নয়, বাম ঘরানার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও আমেরিকার প্রশংসা করছে। কিন্তু আমেরিকাকে নিয়ে কারো তুষ্ট হওয়ার কোন কারণ নেই; কারণ আমেরিকার শত্রু-মিত্র তৈরি হতে খুব বেশি সময় লাগে না। আওয়ামী লীগ সরকারকে কিছুদিন একটু ঝাঁকুনি দেওয়ার চেষ্টা করেছে, ফেলে দেওয়ার ইচ্ছে বোধ হয় নেই। হিলারি ক্লিনটনকে শেখ হাসিনা কী বলেছেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কতটুকু কটুবাক্য উচ্চারণ করেছিলেন তা আমেরিকার জন্য কোন খুব বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ইস্যু নয়; তাদের কাছে প্রধান ইস্যু হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ আমেরিকার স্বার্থবিরোধী কোন কাজ করছি কি না।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ সম্পর্কিত আমেরিকার বিভিন্ন বিবৃতি ও কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। র‍্যাব সৃষ্টি হয়েছে ২০০৪ সনে বিএনপি'র আমলে, বিএনপি'র আমলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে, ক্রসফায়ারে লোক মারা গেছে এবং তা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলেছে। এই সকল হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার যুক্তি থাকলেও একটি কথা অনস্বীকার্য যে, ক্রসফায়ারে কিছু সন্ত্রাসী মারা না গেলে আজ বাংলাদেশ নরকে পরিণত হতো। প্রশ্ন হচ্ছে, আমেরিকা র‍্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে এত দেরি করল কেন? মিসরে নির্বাচিত সরকারকে জোরপূর্বক হটিয়ে সেনাশাসন কায়েম হলো, সৌদি আরবের লোক তুরস্কে গিয়ে তাদের দূতাবাসে ডেকে নিয়ে একজন সৌদি সাংবাদিককে করাত দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করলো—আমেরিকা কি এই দুটি দেশের উপর কোন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে? আরও জঘন্য অপরাধ করলেও নিষেধাজ্ঞা দেবে না, কারণ এই দুটি দেশ আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী নয়। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে, দেশের সমৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত হলে আমেরিকার আশীর্বাদ প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ সরকার একটু কৌশলী হলে আমেরিকা রাতারাতি তাদের ভোল পাল্টিয়ে ফেলবে।