‘স্পার্টা ৩’ নামের সমুদ্রগামী জাহাজের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাশিয়া সেই জাহাজের নাম ও রঙ পাল্টে ‘উরসা মেজর’ নামকরণ করে এবং সেই জাহাজে করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পণ্য নিয়ে এলে জাহাজটিকে মোংলা বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। রং ও নাম পাল্টানোর সংবাদটি দিয়েছে আমেরিকা। আমাদের দেশেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৮ সনে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সম্মুখে বাসের জন্য অপেক্ষারত দুইজন শিক্ষার্থীর জাবালে নূর পরিবহনের ধাক্কায় মৃত্যু হলে বাসমালিক তাদের বাসের রং ও নাম পরিবর্তন করে ফেলেছিল। ব্যাপক ছাত্র-আন্দোলনের ভয়ে জাবালে নূর পরিবহনের যা ঘটেছিল ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে রাশিয়ার পণ্যবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনীত পণ্য খালাসের অনুমতি দিতে রাশিয়া চাপ দিলেও বাংলাদেশ সরকার জাহাজটিকে বন্দরে ভিড়তে দেয়নি। মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছে। আমেরিকার বিরোধিতা করে বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকা খুব সহজ নয়। তাই বোধ হয় আমেরিকার বন্ধুত্বকেও ভয় হয়। আমেরিকা যার বন্ধু তার শত্রুর দরকার নেই—এই মন্তব্যটি করেছিলেন দক্ষিণ ভিয়েতনামের এক সময়ের ডি ফ্যাক্টো ফার্স্ট লেডি ম্যাডাম নু। আমেরিকা ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে তাদের জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আফগানিস্তান থেকে রাশিয়ান বামপন্থী সরকারকে হটানোর জন্য আমেরিকা তালেবান সৃষ্ট করেছিল, এখন সেই তালিবান আমেরিকার অন্যতম শত্রু। আরব বসন্তের অন্যতম ইন্ধনদাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ বিবেচনা করে মধ্যপ্রাচ্যের এক এক দেশে এক এক নীতির অনুসরণ করেছে। লিবিয়ায় অভ্যুত্থানকারীদের সমর্থন করে মুয়াম্মার গাদ্দাফীর পতন ঘটালেও মিশরে কিন্তু অভ্যুত্থানকারীদের বিপক্ষে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে সমর্থন করেছে আমেরিকা। মুয়াম্মার আল গাদ্দাফী এবং সাদ্দাম হুসেইনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক ছিল রীতিমত সাপে-নেউলে। সাদ্দাম হুসেইনের পতনের পর আমেরিকা তাদের ভুল স্বীকার করেছিল। লিবিয়ার গাদ্দাফী পরে বুঝতে পেরেছিলেন যে, আমেরিকার সাথে রেষারেষি করে টিকা যাবে না এবং এই উপলব্ধি থেকেই ২০০৩ সনে মার্কিনীদের হাতে সাদ্দাম হুসেইনের পতনের পর তিনি লিবিয়ার সকল গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলেন। এছাড়াও তিনি ১৯৮৮ সনে স্কটল্যান্ডের লকারবির আকাশে মার্কিন বিমানে বিস্ফোরণের জন্য দায় স্বীকার করে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণও প্রদান করেন। এমন নতিস্বীকার করেও গাদ্দাফী কিন্তু বাঁচতে পারেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি পরিচালিত হয় তার নিজস্ব স্বার্থকেন্দ্রিক, এক্ষেত্রে তারা বন্ধুত্ব বা শত্রুতাকে স্থায়ী হিসেবে বিবেচনা করে না। পৃথিবীর ৭০টি দেশে আমেরিকার প্রায় ৮০০টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। বহির্বিশ্বে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সদস্য কর্মরত। কিন্তু আমেরিকা তাদের পরম বন্ধু ইরানের বাদশাহ শাহ পাহলভী বা ফিলিপিন্সের ফার্দিনান্দ মার্কোসকে রক্ষা করেনি, রক্ষা করেছে আমেরিকার স্বার্থ। ইউক্রেনকে রক্ষা করা আমেরিকার লক্ষ্য নয়, আমেরিকার লক্ষ্য রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়া। রাশিয়ার দ্বারগোড়ায় ন্যাটোকে সম্প্রসারিত করে রাশিয়াকে প্রলুব্ধ করেছে ইউক্রেন আক্রমণ করতে। ইউক্রেনকে সর্বাধুনিক অস্ত্র দিয়ে আমেরিকা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে রাশিয়ার অর্থনীতি ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছে। প্রায় সকল মিডিয়া পাশ্চাত্যের হাতে, তাদের বরাতে সারা পৃথিবীর মানুষ তথ্য পায়; তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ার অস্ত্র নেই, সৈন্য নেই, রাশিয়া পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। অবশ্য রাশিয়ার পুতিনও এখন শান্তির কথা বলছেন। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ বা শান্তি স্থাপনের কোন সম্ভাবনা নেই; কারণ ইউক্রেনের যে চারটি অঞ্চলকে রুশ ফেডারেশনের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে সেই চারটি অঞ্চল রাশিয়া ছাড়বে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে এই চারটি অঞ্চলে রাশিয়ার মালিকানা স্বীকার করে ইউক্রেনের ভলোদিমির জেলেনস্কির পক্ষে শান্তিচুক্তি করা প্রায় অসম্ভব। যুদ্ধ জিইয়ে রেখে স্থায়ীভাবে রাশিয়াকে ব্যতিব্যস্ত রাখাই আমেরিকার উদ্দেশ্য। রাশিয়ার তেলের মূল্য নির্ধারণ করছে আমেরিকা—এই অপমানজনক শর্তও এক সময় রাশিয়াকে হয়তো মেনে নিতে হবে। যেদিন রাশিয়ার তেলের দাম বেঁধে দেওয়া হয়, সেদিনই বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য ২ শতাংশ বেড়েছে। এই সমস্যার সমাধান হতে পারে দুটি উপায়ে—এক, পারমাণবিক যুদ্ধ; দুই, সম্পূর্ণ ইউক্রেন দখল করে নেওয়া। রাশিয়া হয়তো এই দুটি পথের একটি বেছে নিতে এক সময় বাধ্য হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার অতিপ্রয়োগের কারণে বিশ্বে নতুন মেরুকরণের উদ্ভব হচ্ছে। কিউবার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সেই ১৯৬২ সন থেকে। আমেরিকার কথামতো না চলার কারণে ভেনিজুয়ালাকেও তারা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, ভেনিজুয়ালার উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। রাশিয়া এবং চীনের সহযোগিতায় কিউবা এবং ভেনিজুয়েলা এখনো টিকে আছে। রাশিয়া এবং ইরান থেকে তেল আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারত এবং চীনকে বিশাল মূল্যছাড়ে রাশিয়া এবং ইরানের কাছ থেকে তেল কেনার সুযোগ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় উত্তর কোরিয়া চীন এবং রাশিয়ার বলয়ে ভিড়তে বাধ্য হচ্ছে। একইভাবে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমার চীনের মিত্র হয়ে উঠেছে। কম্বোডিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারাও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। রাশিয়া এক সময় চীন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে; কিন্তু চীন এবং রাশিয়া উভয় দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ভ্লাদিমির পুতিন তার কৌশলগত মিত্র হিসেবে চীনকে বেছে নিয়েছেন।

বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো এখন জনগণের চেয়ে আমেরিকাকে বেশি বিশ্বাস করে। আমেরিকাও তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে বিরোধী দলগুলোর আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। মুসলিম দেশগুলোর সরকারের সাথে আমেরিকার সুসম্পর্ক থাকলেও সামগ্রিকভাবে মুসলমানগণ আমেরিকার ঘোর বিরোধী; এর যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে। ইরাক, ইরান, লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান প্রভৃতি মুসলিম দেশের উপর আমেরিকার সামরিক অভিযান সাধারণ মুসলমানদের ক্ষুব্ধ করেছে। ফিলিস্তিনি মুসলমানদের উপর ইসরাইলের বর্বরোচিত নির্যাতনে আমেরিকার অন্ধ সমর্থন সারা বিশ্বের মুসলমানকে আমেরিকার প্রতি বিদ্বেষী করে তুলেছে; বাংলাদেশের মুসলমানেরাও তাই আমেরিকার প্রতি বিক্ষুব্ধ। কিন্তু ইদানীং বাংলাদেশের কিছু মুসলমান বিশেষ করে যারা আওয়ামী লীগ বিরোধী তারা আমেরিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমেরিকার প্রশংসায় শুধু বিএনপি বা জামায়াত নয়, বাম ঘরানার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও আমেরিকার প্রশংসা করছে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বামপন্থীরা ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিচ্ছে না। বিএনপি আন্দোলনের পাশাপাশি বিদেশিদের কাছে ধর্ণা দিয়ে সরকারের উপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। তাই আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টিকটু আচরণ নিয়েও বিএনপি বা বাম দলগুলো বিরূপ মন্তব্য করছে না, অথচ এরা দেশের সব কিছুতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ‘র’-এর ষড়যন্ত্র খুঁজে পায়।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ সম্পর্কিত আমেরিকার বিভিন্ন বিবৃতি ও কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার উপর আরোপিত ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছু সত্য উচ্চারণ করেছেন এবং সারা পৃথিবীতে বিরাজমান মূল্যস্ফীতির জন্য তিনি আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন। এতে আমেরিকার নাখোশ হওয়ার সমূহ কারণ রয়েছে। চীনের সাথে মাখামাখি আমেরিকার পছন্দ হওয়ার কথা নয়। বিশ্বে বিরাজমান বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট অস্থিরতায় বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি শ্লথ হয়ে গেছে, ভবিষ্যতে আরও দুর্যোগ নেমে আসতে পারে। এই পরিস্থিতিতেও শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার অবদানের কথা বারবার স্মরণ করেছেন। উপরন্তু বাংলাদেশ এই পর্যন্ত ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘে চারবারের মধ্যে দুইবার প্রস্তাবের পক্ষে এবং দুইবার ভোটদানে বিরত থাকে। আমেরিকার অবস্থানের পক্ষে বাংলাদেশ দুইবার থাকেনি—এটাও আমেরিকার নাখোশ হওয়ার কারণ হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী দেশ। তার মোড়লপনার কথা কারও অজানা নয়। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে আমেরিকার আশীর্বাদ প্রয়োজন। পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তো কোন রাখঢাক না রেখেই তার ক্ষমতা হারানোর জন্য আমেরিকা দায়ী করছেন। আমেরিকার কথামতো না চলার কারণে পানামার সামরিক একনায়ক জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে তার দেশ থেকে আমেরিকার সেনাবাহিনী জোর করে উঠিয়ে নিয়ে আমেরিকার আদালতে বিচার করে জেলখানায় রেখে দিয়েছিল। আমেরিকা কিন্তু ভারতকে সমীহ করে চলছে, কারণ রাশিয়ার এই জাহাজটি বাংলাদেশে আসার আগে ভারতের কেরালা বন্দরে পণ্য খালাস করেছে এবং জাহাজ ফেরত যাওয়ার পথে আমাদের পণ্যগুলো ভারতে খালাস করে রেখে গেছে। বিপদ শুধু আমাদের মতো গরিব দেশের। রাশিয়া এবং আমেরিকা উভয় দেশই এই জাহাজ নিয়ে বাংলাদেশকে হুমকি দিচ্ছে, আমেরিকার হুমকি হজম করার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকা জাহাজ মোংলা বন্দরে প্রবেশ করতে দিলে বাংলাদেশের উপর আমেরিকা ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা আসার সম্ভাবনা ছিল। ১৯৭৪ সনে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিউবায় চটের বস্তা বিক্রি করায় আমেরিকা বাংলাদেশে দুর্বিষহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিল। আমেরিকা এবং ইউরোপে আমাদের পোশাক রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশ গভীর সঙ্কটে নিপতিত হবে।

তবে আমেরিকা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধী নয়, একটু ধাক্কা দিয়ে নিজের শক্তি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি শুধু স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। রাশিয়ার জাহাজ ফেরত দেওয়ার সাথে সাথে আমেরিকার সুর কিছুটা নমনীয় হয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে আমেরিকা সাধুবাদ জানিয়েছে। তাই রাশিয়ার জাহাজ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান যুক্তিযুক্ত।