যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১১ জন ধর্ষক সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ভারতে। ভারতের গুজরাট রাজ্যে ২০০২ সনে দাঙ্গা চলাকালে এই ১১ জনের দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন বিলকিস বানু। ধর্ষণ করার পর ২১ বছর বয়সী বিলকিস বানু জ্ঞান হারান, মৃত ভেবে তাকে আর হত্যা করা হয়নি। তখন তিনি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দলবদ্ধ ধর্ষণেও বিলকিস বানু মরেননি, লজ্জায়-ঘৃণায় আত্মহত্যাও করেননি, তিনি বেঁচে ছিলেন লড়াই করা জন্য। বিচারের জন্য তিনি ১৮ বছর আদালতে যুদ্ধ করেছেন। শুধু তাই নয়, ধর্ষণ শুরু করার পূর্বে বিলকিস বানুর সম্মুখে তার তিন বছরের মেয়েসহ তার পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যাও করা হয়। ২০০২ সনে গুজরাটের গোধরা শহরে ট্রেনে ৬০ হিন্দু তীর্থযাত্রী অগ্নিকাণ্ডে নিহত হলে আগুন লাগানোর জন্য মুসলিমদের দায়ী করে সংঘবদ্ধ কয়েকটি হিন্দু গ্রুপ মুসলমান নিধন শুরু করে এবং ঐ নিধনযজ্ঞে বিলকিস বানু এবং তার পরিবারের সদস্যরা ভিকটিম হয়েছিল।
২০০৪ সনে বিলকিস বানু মামলা করেন গুজরাটের একটি আদালতে। কিন্তু গুজরাটের পুলিশ, ডাক্তার, আদালত বিলকিস বানুর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় মামলা স্থানান্তরিত হয় মুম্বাইয়ে। ২০০৮ সনে মুম্বাইয়ের একটি বিশেষ আদালত বিলকিস বানুকে ধর্ষণের দায়ে ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে এবং হাইকোর্টও এই রায় বহাল রাখে। এছাড়াও বিলকিস বানুকে নগদ ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং চাকরি দেওয়া হয়। উপরন্তু যে সকল পুলিশ এবং ডাক্তার তাদের তদন্ত রিপোর্টে অভিযুক্ত খুনি ও ধর্ষকদের রেহাই দিয়েছিল তাদেরও বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। কিছুদিন আগে ভারতের স্বাধীনতার ৭৫তম পূর্তিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এই ১১ আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এদের মুক্তি দেওয়ার পেছনে রাজ্য সরকারের যুক্তি হচ্ছে, অপরাধীরা ইতোমধ্যে ১৫ বছর জেল খেটেছে, এরা সবাই ব্রাহ্মণ এবং জেলে তাদের আচরণ ভাল ছিল। দেশের সংবিধান, সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত, কেন্দ্র ও গুজরাট রাজ্য সরকারের রেমিশন নীতি অনুযায়ী ধর্ষণ ও পরিকল্পিতভাবে খুনের অপরাধে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের কোনও অবস্থাতেই ক্ষমা প্রদর্শন করা যায় না। ধর্ষণ অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মৃত্যু পর্যন্ত ভোগ করাটাই নিয়ম ভারতে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকার ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে, ২০০৮ সনে তাদের শাস্তি হওয়ার পর এই নতুন নীতি গ্রহণ করায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উক্ত ১১ জন ধর্ষকের জন্য তা প্রয়োগ করেনি। সরকার সহায়ক হলে অপরাধীর নিষ্কৃতি পাওয়া সহজতর হয়। সরকারের সহায়তা ছিল বলেই দাঙ্গায় নিহত বিলকিস বানুর সাতজন স্বজনকে পরবর্তীতে নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়।
সরকার সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বলেই দাঙ্গায় হত্যাকারী ও ধর্ষককে মুক্তি দিতে পেরেছে। ধর্ষক এবং খুনিদের মুক্তি দেওয়ার সাথে সাথে গুজরাটে হিন্দু ধর্মের মৌলবাদীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার পরিলক্ষিত হয়। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি’র সঙ্গে যুক্ত ধর্মান্ধ দলগুলো আনন্দে আত্মহারা হয়ে মিষ্টি কিনে খেয়েছে এবং মিষ্টি বিতরণ করেছে, পরস্পর আলিঙ্গন করে বিজয়ের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অফিসে তাদের ফুলের মালা পরিয়ে কপালে তিলক কেটে মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস যত বেশী বাড়ছে তত বেশী শঙ্কা বাড়ছে বিলকিস বানুর। তার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন বিলকিস বানু। কোন শত্রুতা ছাড়া শুধু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে যারা হাসতে হাসতে সাতজন মুসলমানকে হত্যা করতে পারে, অন্তঃসত্ত্বা একজন নারীকে দলবদ্ধ হয়ে ধর্ষণ করতে পারে তারা মুক্তি পেয়ে বিলকিস বানুকে পুনরায় নির্যাতন করবে না তার নিশ্চয়তা সরকারও দিতে পারবে না। ভোটের জন্য মোদি সরকার ধর্মান্ধদের তোয়াজ করছে।
২০০২ সনে যখন গুজরাটে দাঙ্গা হয় তখন গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাঙ্গা ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ উঠে। কিন্তু আদালত বলে দিয়েছে দাঙ্গায় মোদির জড়িত থাকার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গুজরাটে দাঙ্গা বাঁধানোর জন্য আমেরিকা নরেন্দ্র মোদিকে দায়ী করে আমেরিকায় মোদির ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। গুজরাটে দাঙ্গার পর নরেন্দ্র মোদি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেন যে, কয়েক বছর পরই তিনি হয়ে যান সমগ্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলে আমেরিকা তড়িঘড়ি করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমেরিকায় নিয়ে লালগালিচা সংবর্ধনা প্রদান করে। ধর্মের জজবা তুলে মানুষ হত্যার পরও নরেন্দ্র মোদি ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে এত বিপুল জনসমর্থন পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হলেও ভারতের সবাই ধর্মনিরপেক্ষ নন, বরং বেশীরভাগ সাম্প্রদায়িক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ধর্ম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জেতার মুখ্য হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের শাসকেরা জনতার বৃহত্তর অংশের সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে প্রশ্রয় দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম; তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত দিয়ে জনতাকে প্রভাবিত করতেন, জনতার মনোভাব বিবেচনা করে তিনি কখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
ভারতের ডানপন্থী ও উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী কয়েকটি সংগঠনের পরামর্শে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি’র সরকার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। কারণ হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস সরে গেলে বিজেপি’র পুনরায় ক্ষমতায় আসা সম্ভব হবে না। সংগঠনগুলোর লক্ষ্য একটাই, ভারতকে রামরাজ্য বানানো। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, হিন্দুরাই ভারতের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হবে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো মনে করে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ভারতের অখণ্ডতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলে হিন্দু আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে। ভারতের সবাইকে ধর্মান্ধ করতে তারা মানুষের হাতে গেরুয়া বসন তুলে দিচ্ছে। মানুষ নিচ্ছেও। নির্বাচন এলে নরেন্দ্র মোদিও গেরুয়া পোশাক পরেন। কোন নির্বাচন এলে এরা ধর্মীয় ইস্যু সৃষ্টি করে। বিলকিস বানুর ধর্ষকদের শাস্তি মওকুফ করার পেছনেও রয়েছে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা। গুজরাটের বিধানসভার নির্বাচন সন্নিকটে, তাই উগ্র জাতীয়তাবাদী ধর্মান্ধদের সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশায় দাঙ্গাবাজ এই ১১ জন ধর্ষককে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে নির্বাচনে জেতার প্রধান নিয়ামক ধর্ম। এই কারণেই ধর্ষকদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তে বিজেপি’র জনসমর্থন বাড়বে, অন্যদিকে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলের জনসমর্থন কমবে। যেদিন ধর্ষকদের মুক্তি দেওয়া হয় সেইদিনই নরেন্দ্র মোদি নারীদের জয়গান গেয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, নারীর সম্মান রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। এমন দ্বিমুখী আচরণের জন্য বিরোধী দলের নেতারা মোদিকে ‘নির্লজ্জ বেহায়া’ বলে অভিহিত করেছেন। কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা মোদিকে ‘নির্লজ্জ বেহায়া’ যাই বলুক না কেন জনগণ কিন্তু মোদির গেরুয়া পোশাকের পক্ষে, মোদিকেই তারা ভোট দেবে।
ঔপনিবেশিক শাসনকালের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রধান দুইটি ধর্মের মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস আর সংঘাতের যে বীজ ইংরেজেরা বপন করেছিল তা দেশভাগের সময় রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায়। এর ফলে এক পর্যায়ে জাতীয়তাবাদের স্থলাভিষিক্ত হয় সাম্প্রদায়িকতা। হিন্দু আর মুসলমানের জন্য আলাদা আলাদা দেশ করার আন্দোলনে ১৯৪৬ সনে শুরু হওয়া দাঙ্গা আজ অবধি থামেনি। মাতৃভূমি ত্যাগ করে ভারতের বহু মুসলমান পাকিস্তানে এল, পাকিস্তানের বহু হিন্দু ভারতে গেল, কিন্তু পাকিস্তানকে হিন্দু-শূন্য এবং ভারতকে মুসলমান-শূন্য করা গেল না। কংগ্রেসের দুইবারের প্রেসিডেন্ট মাওলানা আবুল কালাম আজাদ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশভাগের বিরোধিতা করে গিয়েছেন এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, পাকিস্তান হলে ভারতীয় মুসলমানদের সমস্যা আরও বাড়বে। কারণ ১৯৪৬ সনের তুলনায় এখন ভারত উপমহাদেশের লোকজন অনেক বেশী ধর্মান্ধ। জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো আত্মশক্তিতে বলীয়ান কোন নেতা নেই, এই নেতারা কখনো জনগণের ভুল সিদ্ধান্তে তাড়িত হননি এবং নির্বাচনে জেতার জন্য সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেননি।
ধর্ষণব্যাধি সমাজের সর্বত্রই ক্যানসারের মতো বিরাজমান। কিন্তু বিলকিস বানুর ধর্ষণ ব্যাধিগ্রস্ত পুরুষ দ্বারা হয়নি, এই ধর্ষণ হয়েছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের টার্গেট করে। ধর্ষক রাজনৈতিক মঞ্চকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছে। গণতন্ত্রের নামে রাজনৈতিক দলতন্ত্রের এই যে ব্যভিচার তা হিন্দুত্ববাদী ধর্ষকদের দুঃসাহসী করে তুলছে। স্বাধীনতার প্রায় ৩০ বছর পর ১৯৭৬ সনে ভারত সেক্যুলার রাষ্ট্র হয়েছে। কিন্তু ভারতের সব মানুষ সেক্যুলার নয়। নির্বাচন এলে বাম-ডান সব নেতা মন্দিরে পড়ে থাকেন। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-ভোট হারানোর ভয়। সব দল বুঝতে পেরেছে ‘সেক্যুলার’ শব্দটি ভারতের সংবিধানে থাকলেও মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে এর কোন মূল্য নেই। সমাজ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। ভারতে ধর্ম ও রাজনীতি মিলেমিশে একাকার। অন্ধকার ভারত হিন্দুত্ববাদী ধর্মান্ধদের হাতে তুলে দেওয়ার নির্বাচনী কর্মকাণ্ড মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করবে। এই পরিস্থিতিতে বিলকিস বানুদের সুরক্ষার বিষয়ে নিশ্চিত নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার আর কেউ নেই। বৃহত্তর সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে ভারতের যে গর্ব তা আর থাকল না।
তবুও বিশ্বাস হারাতে নেই, সমাজের সর্বত্র পচন ধরলেও কিছু মানুষ এখনও সুনীতির পক্ষে সংগ্রাম করতে চান, প্রয়োজন শুধু সংঘবদ্ধ হয়ে উঠার। বিলকিস বানুর ধর্ষকদের মুক্তির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন সিপিআইএম-এর পলিটব্যুরো সদস্য সুভাষিণী আলী, তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র, অধ্যাপিকা রূপরেখা ভার্মা, সাংবাদিক রেবতী লাউলসহ ছয় হাজার মানুষ। এভাবে মুক্তচিন্তক অসাম্প্রদায়িক সকল সুনাগরিককে সংঘবদ্ধ হয়ে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ। সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়া না হলে সামাজিক সুস্থতা প্রত্যাশা করা যায় না। চেনাজানা পৃথিবীটাকে অসুস্থ হতে দেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, ধর্ষকদের মুক্তি শুধু বিলকিস বানুর প্রতি উপহাস নয়, সব ধর্ষিতার প্রতিও উপহাস।