রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমদানি পণ্যে তেল-গ্যাসের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় সবগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় তেল-গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। তাই বর্তমান অবস্থায় তিনি জনগণকে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হতে অনুরোধ করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রচুর পাওয়ার প্ল্যান্ট করা হয়েছে। গ্যাস দিয়ে ৬৪ শতাংশ পাওয়ার প্ল্যান্ট চলে। চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আমাদের থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ এখন উৎপাদন কম করা হচ্ছে, কিছু প্ল্যান্ট বন্ধ রাখা হয়েছে। ২০২০ সনে প্রতি ইউনিট গ্যাসের আন্তর্জাতিক দর ছিল ৪ থেকে ৬ মার্কিন ডলার, এখন প্রতি ইউনিটের দর হচ্ছে ৪০ ডলার। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এত বেশী দরে গ্যাস ক্রয় করা জাতীয় স্বার্থে সমীচীন নয় বলে সরকার মনে করছে। বর্তমানে এক ইউনিট বিদ্যুৎ তৈরি করতে খরচ পড়ে ১২ টাকা, অথচ সরকার সেই বিদ্যুৎ বিক্রি করছে মাত্র ৬ থেকে ৭ টাকায়।
সরকারের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বা লোকসান কভার করতে হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ালে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী জনগণ সরকারের ওপর নাখোশ হবে। শুধু তাই নয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে কলকারখানার উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে জনগণ সরকারকে পছন্দ করবে না। তাই সরকার চাচ্ছে, অধিক মূল্যের তেল-গ্যাস কেনার দরকার নেই, বরং তেল বা গ্যাসভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে বাসা-বাড়িতে লোডশেডিং করাই জাতীয় স্বার্থে শ্রেয়। স্পট মার্কেট থেকে বেশী দরে এখন আর গ্যাস কেনা হচ্ছে না, ফলে গ্যাসের অভাবে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই লোডশেডিং হচ্ছে; তবে নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কয়েকটি এ বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চালু হলে লোডশেডিং হয়ত আর থাকবে না। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোও জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছে। ইতালি, জার্মানি, ইংল্যাণ্ড প্রভৃতি উন্নত দেশেও এখন বিদ্যুৎ সরবরাহে রেশনিং করতে হচ্ছে; তবে তাদের অঢেল টাকা থাকায় দাম বেশী হওয়া সত্ত্বেও তারা তেল-গ্যাস কিনতে পারছে। তবুও জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বহু দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে লোডশেডিং করা হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় দৈনিক ৯ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। লোডশেডিং সমস্যায় পড়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা এবং নেপাল।
লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে বেশ আমোদজনক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের অহঙ্কারী বক্তব্যকে তুলাধুনো করা হচ্ছে। মন্ত্রী আর নেতাদের মুখের লাগাম টানতে কিছু তুলাধুনো হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, যে কোন খাতে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া তত সহজ নয়; কারণ সংস্থাপিত বহু প্রকল্প মেরামত করার প্রযুক্তিগত জ্ঞানও বাংলাদেশের নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েও হতে পারে না, এক বছরের উৎপাদন উদ্বৃত্ত হলেও পরের বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘাটতি হয় তার দ্বিগুণ। বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থায় আমাদের কিছু ভাবতে হবে—বৈশ্বিক কোন বিরূপ পরিবেশে এক কোটি প্রবাসী শ্রমিক ফেরত এলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমবে। বাংলাদেশ রপ্তানি আয় সম্পূর্ণ গার্মেন্টসের ওপর নির্ভরশীল, কোন কারণে গার্মেন্টস রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলংকা হতে দেরি হবে না। পৃথিবীর বহু দেশ শুধু পর্যটনশিল্পের আয় দিয়ে চলছে। করোনা-উত্তর পর্যটনশিল্প আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে, কক্সবাজারে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও কোন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসে না। ধর্মীয় বিধিনিষেধ আর নিরাপত্তার অভাব—পর্যটনশিল্পকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। তাই বাংলাদেশের কোন অর্জন নিয়ে অতিরিক্ত অহংকার করা হলে পরবর্তীতে তা বুমেরাং হতে পারে।
বাংলাদেশ গ্যাসের উপর ভাসছে—এমন একটি ভুল ধারণা বিএনপি’র আমলে চালু ছিল, তাই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান মাটির নিচে গ্যাস জমিয়ে না রেখে বিদেশে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। গ্যাসের মজুত দিন দিন কমছে; অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় গ্যাস উৎপাদ বৃদ্ধি করেও চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন নিয়মিত গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। গ্যাস আবিষ্কার ও উত্তোলনে আমাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান পর্যাপ্ত নয়, গভীর সমুদ্রে গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাংলাদেশের কোন সামর্থ্যও নেই। শুধু এই কারণেই তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সংশ্লিষ্ট বিদেশি দরদাতার অনুকূল শর্তাদি এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় থাকে না। তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশকে কয়েকটি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা যে সকল ব্লকে একটু বেশী সেই সকল ব্লক আবার বিদেশিদের দেওয়া যাবে না, নিজেদের প্রতিষ্ঠান বাপেক্স করবে। শুধু তাই নয়, বিদেশিদের সুবিধা দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের কোন চুক্তিও করা যাবে না—জাতীয় স্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়ে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। আমাদের দেশে সমালোচনার আরেকটি উর্বর ক্ষেত্র দুর্নীতি, যে কোন কাজ হাতে নেয়ার সাথে সাথে ঘুষ আর দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকে। ঘুষ আর দুর্নীতি রোধ করে কাজ করার বাসনা থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়েনি, পণ্যের দাম বেড়েছে রাশিয়ার ওপর আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশের স্যাংশন বা অর্থনৈতিক অবরোধে। কোন একটি দেশের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপে আমেরিকার নীতি হচ্ছে, শুধু আমেরিকা নয়, তারা অন্য কোন দেশকেও সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে ব্যবসা করতে দেবে না। কিউবার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে ১৯৬২ সনে, বঙ্গবন্ধুর আমলে কিউবার কাছে কিছু চটের বস্তা বিক্রি করার কারণে বাংলাদেশের জন্য প্রেরিত গমভর্তি জাহাজ আমেরিকা গভীর সমুদ্র থেকে ফেরত নিয়ে যায়; ১৯৭৪ সনে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার পেছনে এই ঘটনাটিও দায়ী। তাই বাংলাদেশ ইচ্ছে করলেও এখন রাশিয়ার সস্তা তেল কিনতে পারছে না; কিনলে হয়ত আমেরিকা এবং ইউরোপ বাংলাদেশের গার্মেন্টস ক্রয় বন্ধ করে দেবে। তাই বাংলাদেশকে বলতে হচ্ছে, রাশিয়ার তেল আমাদের তেল শোধনাগারের জন্য উপযোগী নয়। চীন এবং ভারত অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশী শক্তিশালী, চীনের রিজার্ভ প্রায় ৩০০০ বিলিয়ন ডলার, আর ভারতের রয়েছে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার। চীন এবং ভারত আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ধার ধারছে না, সস্তায় তারা তেল কিনে মজুত গড়ে তুলছে। ভারত নাকি এই তেল পরিশোধনপূর্বক তা আবার বেশী দামে ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রিও করছে। জার্মানি, ইতালি এবং নেদারল্যান্ডস এখনো রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করেনি।
ইউরোপের নিজস্ব তেল বা গ্যাস নেই, ইউরোপের সবগুলো দেশ জ্বালানি তেল আমদানি করেই তাদের বিপুল চাহিদা পূরণ করে থাকে। ইউরোপে গ্যাসের যে চাহিদা তার ৪০ শতাংশ পূরণ করত রাশিয়া। রাশিয়ার কিছু অংশ এশিয়া মহাদেশে, আর কিছু অংশ ইউরোপে। বিরাট বিরাট পাইপ বসিয়ে রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করে থাকে। ইউরোপের লোকেরা শিল্প-কারখানা ছাড়াও বাসা-বাড়ি গরম রাখার স্বার্থে প্রচুর গ্যাস ব্যবহার করে। ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে রাশিয়া তাদের মুদ্রা রুবলে গ্যাসের মূল্য পরিশোধের শর্ত যুদ্ধের শুরুতে আরোপ করেছিল। এমন শর্তারোপে বিশ্ববাজারে রুবেলের চাহিদা বেড়ে যায়। যে সকল দেশ এই শর্ত মানতে সম্মত হয়নি সেই সকল দেশে গ্যাস রপ্তানি রাশিয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে ইউরোপসহ আরও কিছু দেশকে তেল আর গ্যাসের জন্য হন্যে হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোতে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। ইরানের উপরও আমেরিকা অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, নতুবা তেল-গ্যাস নিয়ে এমন ক্রাইসিস হতো না।
অবস্থা বিবেচনা করে সম্পদের ব্যবহারে পৃথিবীর ধনী দেশগুলোও সংযত হয়ে থাকে। কঠোর অবরোধের মধ্যে কিউবা, ইরান, উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলার মিতব্যয়ী না হয়ে উপায় নেই। শ্রীলংকা যথাসময়ে মিতব্যয়ী হয়নি বলে এখন বাঁচতে পারছে না। নিজের সামর্থ্য না থাকলে কেউ ধারও দেয় না, এখন শ্রীলঙ্কার হাহাকার কেউ শুনতে চাইছে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা একেবারেই নেই, বিদ্যুৎ নেই, উৎপাদন স্থবির, রপ্তানি নেই, বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে আমদানিও নেই। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপালের অবস্থা শ্রীলঙ্কার অবস্থার কাছাকাছি। তাই সতর্ক আর সাবধান আমাদের হতেই হবে। ইতোমধ্যে সরকার আলোকসজ্জা বন্ধ করেছে, দোকানপাট রাত আটটার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আরও কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথাও ভাবছে। শুধু গ্যাস নয়, জ্বালানি তেল এবং বৈদেশিক মুদ্রার খরচেও আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। গত বছরের তুলনায় তেলের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশ। আমরা আশা করব বাহুল্য খরচ বাদ দেওয়ার দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু হোক, মন্ত্রীপাড়ায়ও লোডশেডিং হোক, বিলাসসামগ্রীর আমদানি বন্ধ হোক, মন্ত্রী-এমপি-আমলাদের গাড়ির তেল-খরচ কমিয়ে দেওয়া হোক, স্যুট পরে অফিসে যাওয়া নিষিদ্ধ হোক, অপ্রয়োজনীয় সেমিনার-কর্মশালার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন রহিত হোক, বিয়ে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো দিনের আলোয় অনুষ্ঠিত হোক, ডিজিটাল যুগে ঘরে বসে অফিস করার ব্যবস্থা নেয়া হোক, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ছাড়া বিদেশে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ নাজায়েজ করা হোক।
লোডশেডিং কলকারখানায় করা যাবে না, উৎপাদন অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে কলকারখানায় বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করে এমন ব্যয় সংকোচন করাও সমীচীন হবে না। গ্যাসের সঙ্কটের কারণে সরকারকে যে কাজটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতে হবে তা হলো বাংলাদেশের গ্যাস উৎপাদন এবং বিতরণসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম দুর্নীতিমুক্ত করা। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার অংশ হলেও বিদ্যুৎ ব্যবহার না করে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার কোন মানে হয় না। বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্লান্টের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমন্বয় নিয়ে পরিকল্পনা থাকা বাঞ্ছনীয়। সিস্টেম লসের নামে যে দুর্নীতি হয় তা রোধ করা সম্ভব হলে দেশে গ্যাস আমদানি বা লোডশেডিং-এর দরকার হবে বলে মনে হয় না।