১৯৭৪ সনে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ভর্তি জন্য তখন আমাদের প্রতিটি সাবজেক্টে আলাদা আলাদাভাবে পরীক্ষা দিতে হতো। অর্থনীতিশাস্ত্রে পড়ার জন্য আমি ভর্তি হই, কিন্তু কয়েক মাস পরেই আমি বুঝে গেলাম যে, অর্থনীতি আমার উপযোগী সাবজেক্ট নয়; কারণ অর্থনীতি পড়তে হলে অবশ্যই সাবসিডিয়ারি পরিসংখ্যান পড়তে হবে। এসএসসি এবং এইচএসসি-তে আমি ছিলাম মানবিক বিভাগের ছাত্র। আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই মুনির উদ্দিন আহমদ তখন ফার্মাসিতে পড়েন, আমি ফজলুল হক হলে তার রুমে মেঝেতে বিছানা করে ঘুমাই। তিনি আমাকে তার অর্থনীতি পড়ুয়া এক বন্ধুর কাছে পাঠালেন, বন্ধু স্পষ্ট করে বলে দিলেন যে, আমার অর্থনীতি নিয়ে পড়া ঠিক হবে না, কারণ অঙ্কশাস্ত্রে ভাল জ্ঞান না থাকলে অর্থনীতি আয়ত্ত করা কঠিন। আমি ভর্তি পরীক্ষায় আরও কয়েকটি সাবজেক্টে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম, কিন্তু কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার কারণে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে সবাই ভর্তি হয়ে যায়। আমি অনেক তদবির করে কয়েক মাস পর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হই। বসতাম সব থেকে পেছনের টেবিলে। তাই কারো সাথে পরিচয় হয়ে উঠেনি। সম্ভবত প্রথম বর্ষের মাঝামাঝি সময়ে বনভোজনে যাওয়ার পথে সতীর্থ শফিকুল ইসলাম ইউনুসের সাথে পরিচয় হয়। এই পরিচিতি পরে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে রূপ নেয়।

শফিকুল ইসলাম ইউনুস একাডেমিক লেখাপড়ার প্রতি বেশী মনোযোগী ছিলো না। সে খুব কম ক্লাস করেছে। আমার করা নোট পড়ে সে অনার্স পাস করে। ছাত্রজীবনে সাপ্তাহিক ‘সাম্প্রতিক’ পত্রিকার সাথে এত বেশী সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল যে, তার এমএ পরীক্ষা দেওয়ার আর কোন ইচ্ছেই ছিল না, তার আগ্রহ সাংবাদিকতা করা। এমএ ডিগ্রি ছাড়া একজন সাংবাদিকের সর্বত্র অবমূল্যায়ন হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলার পর ইউনুস এমএ পরীক্ষা দিতে সম্মত হয়, শর্ত হচ্ছে পরীক্ষার অব্যবহিত পূর্ববর্তী দুই মাস আমাকে আবু সাইদ হলে গিয়ে তার সাথে পড়তে হবে। আমি প্রতিদিন সকালে ফজলুল হক হল থেকে আবু সাইদ হলে চলে যেতাম, আমি আমার নোটগুলো পড়তাম, ইউনুস শুনত। নিউ মার্কেটের দক্ষিণ পাশে ‘ভাই ভাই’ হোটেলে আমরা দুপুরের খাবার খেতাম, বেশীরভাগ সময় ইউনুস পয়সা দিত। আমার শর্ত ছিল, আমি থাকাকালীন তার কক্ষে তার কোন বন্ধু আসতে পারবে না। প্রথমে শর্ত মেনে পড়াশোনা শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে সে শর্ত ভাঙতে শুরু করে, আমিও কিছুটা শিথিলতা দেখাতে থাকি। তবে বেশীরভাগ আড্ডা হতো পাশের রুমের টিপু ভাইয়ের সাথে। এমএ পরীক্ষায় পাস করে ইউনুস ঠাট্টা করে আমাকে ‘স্যার’ ডাকা শুরু করে।

ইউনুস ছাত্রজীবন থেকেই বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক সিনিয়র সাংবাদিক আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু আমিনুল ইসলাম বেদুর সাপ্তাহিক ‘সাম্প্রতিক’ পত্রিকার সহসম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করে। সহসম্পাদক হলেও পত্রিকাটি প্রকৃতপক্ষে ইউনুস চালাত, বেদু ভাইও ইউনুসকে পুত্রতুল্য স্নেহ করতেন। লেখা সংগ্রহ, মুদ্রণ, বিক্রি সব ইউনুস করত, বেদু ভাই দূর থেকে শুধু তদারকি করতেন। বইমেলা শুরুর প্রাথমিক অবস্থায় বাংলা একাডেমির পুকুর পাড়ে যে কয়েকটি বইয়ের স্টল থাকত তার মধ্যে ইউনুসের একটি অবশ্যই থাকত। বই বিক্রি করার চেয়ে বইমেলায় আগত কবি, সাহিত্যিকদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটানোতে ইউনুসের আগ্রহ ছিলো বেশি। বইমেলায় তার স্টল থাকার কারণে ইউনুস আমাদের অর্ধেক মূল্যে বিভিন্ন স্টল থেকে বই কিনে দিতে পারত। বন্ধু-বান্ধবদের বই উপহার দেওয়া তার অন্যতম শখ। আমাদের সতীর্থ বন্ধু কবি হাসান হাফিজ, আহমেদ বশীর, দিদারুল আলম প্রতিষ্ঠিত লেখক, ইউনুস কখনো তাদের কাছ থেকে সৌজন্য সংখ্যা নিতো না, সতীর্থ লেখকদের প্রকাশিত বই কিনে তার বুকশেলফে রাখত। ইউনুস শুধু বইমেলা থেকে নয়, আজিজ সুপার মার্কেট থেকেও বই কিনে আমাকেসহ বন্ধুদের উপহার দিত।

‘সাম্প্রতিক’ পত্রিকা ছেড়ে দিয়ে ইউনুস ‘সাপ্তাহিক ঢাকা’ পত্রিকা বের করে। তার এই পত্রিকাটির এক সময় প্রচুর চাহিদা ছিল। পরবর্তীতে পত্রিকাটি ‘দৈনিক’ হয়। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের সময় তার ‘দৈনিক ঢাকা’ প্রতিটি হকারের কাছে পাওয়া যেত, যেদিন এরশাদ সরকারের পতন হয় সেদিন ব্যাপক চাহিদার কারণে ‘দৈনিক ঢাকা’ সকাল এবং বিকালে দুইবার ছাপাতে হয়েছিল। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকের হাতেখড়ি হয়েছে তার এই দুটি পত্রিকায়। কবি নির্মলেন্দু গুণ, প্রথম আলোর সোহরাব হাসান, শাবান মাহমুদসহ অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং সাংবাদিক দৈনিক ঢাকা পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরী তাকে স্নেহ করতেন, ইউনুসকে নিয়ে তিনি ভারতের কয়েকটি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ইউনুসের সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠা দেখে তিনি ইউনুসকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে চেয়েছিলেন, ইউনুস নেয়নি। সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক এবং ঢাকা পত্রিকায় দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিকেরা লিখেছেন। তার পত্রিকায় লিখতেন অধ্যাপক কবির চৌধুরী, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, কবি শামসুর রাহমান, খন্দকার মুনীরুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ, সোহরাব হাসান, রিজিয়া রহমান, ম মাহফুজুর রহমানসহ অনেকেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার পত্রিকায় লিখেছেন।

দিলকুশায় ইউনুসের একটি পত্রিকা অফিস ছিল। ছাদের উপর দুই রুমবিশিষ্ট এই অফিসে কবি-সাহিত্যিক-বন্ধু-বান্ধবদের নিয়মিত আড্ডা হতো। আমি আমার বাংলাদেশ ব্যাংকের বহু সহকর্মী নিয়ে প্রায়ই আড্ডা দিতাম। দৈনিক সংবাদের খন্দকার মুনীরুজ্জামান এবং প্রথম আলোর সোহরাব হাসান যেদিন আসতেন সেদিন আমি ছাড়া ইউনুস আর কাউকে ডাকত না। কলাম লেখক হিলাল ফয়েজী, পিবিআই'র বর্তমান মহাপরিচালক, সাংবাদিক ও কবি জাফর ওয়াজেদ যেদিন আসতেন সেদিনের আড্ডা জমে যেত। আমার পীড়াপীড়িতে ইউনুস প্রেস ক্লাবের সদস্য হয়েছিল। প্রেস ক্লাবে আমাদের প্রায়ই খাওয়াত। সতীর্থদের মধ্যে ইউনুসের সাথে আমি এবং খন্দকার হাবিবুর রহমান খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। হাবিব ছিল মহসিন হলে ছাত্রলীগের সভাপতি। আরেক সতীর্থ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক মেম্বার এনায়েত হোসেন তার পত্রিকা প্রকাশে আর্থিক সহায়তা দিত, ইউনুসও কৃতজ্ঞতাচিত্তে তা স্বীকার করত। আমরা যারা ১৯৭৪ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম তারা সবাই মিলে ‘সতীর্থ চুয়াত্তর’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করি এবং আমরা যখন পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়ে কোথাও মিলিত হতাম তখন ইউনুস হয়ে যেত সবার মধ্যমণি। আমাদের পরিবারের ছোট-বড় সকল সদস্যের নিকট ইউনুস খুব প্রিয়জন ছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব, কলাম লেখক আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদের সাথে ইউনুসের সম্পর্ক ছিল ব্যতিক্রমধর্মী—সে প্রবীণ বুদ্ধিজীবীদের সাথে বসে মেজো ভাইয়ের সাথে আড্ডা দিলেও আমার বন্ধু হিসেবে একটা দূরত্ব রক্ষা করার চেষ্টা করত। ইউনুস খুব অতিথিপরায়ণ ছিল, তার অকৃত্রিম আন্তরিকতায় সবাই মুগ্ধ হতো।

সাংবাদিক জীবনে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা উপার্জনের কোন চেষ্টা সে করেনি। শোনা যায় অনেক পত্রিকা চলছে অবৈধভাবে চাঁদাবাজি করে। কিছু কিছু টেলিভিশন এবং পত্রিকার সাংবাদিককে নাকি কোন বেতন দেওয়া হয় না, অবৈধ আয়-উপার্জন করে তাদের চলতে হয়। সাংবাদিকদের দুরবস্থার কথা সরকারও জানে এবং এজন্যই করোনাকালীন সাংবাদিক এবং পত্রিকা-কর্মীদের সরকারের তরফ থেকে প্রচুর প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ইউনুসের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকা সত্ত্বেও সে এই প্রণোদনা গ্রহণ করেনি। ইউনুসকে সরকারের তরফ থেকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে আমি প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ-এর মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদকে অনুরোধ করেছিলাম, জাফর ওয়াজেদ উত্তরে বলেছিলেন, ‘শুধু প্রণোদনা নয়, আমি তার জন্য বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করতে পারি, আপনার বন্ধু নেবে কি না জিজ্ঞেস করুন’। জাফর ওয়াজেদ ঠিকই বলেছেন, ইউনুস কোন প্রণোদনা বা অনুদান নিতে সম্মত হয়নি, সে বলেছিল, ‘আমার চেয়ে অনেক বেশী আর্থিক অনটনে যারা আছেন সরকারের এই প্রণোদনা তাদের প্রয়োজন অধিক’। তবে সে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সাপ্লিমেন্ট ছাপানোর জন্য বিজ্ঞপ্তি পেতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করত, কিন্তু অধিকাংশ সময়ে সফল হতো না। একটা নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ অগ্রিম সমর্পণ করলে নাকি বিজ্ঞাপন পাওয়া সহজ, কিন্তু ইউনুস এমন অবৈধ পথে হাঁটত না।

এমএ পাস করার পর ইউনুস বিয়ে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্রী সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান জাহানারা বেগমকে। জাহানারার বড় ভাই আব্দুল মুসাব্বির চৌধুরী কেএনএস ছিলেন স্পারসোর বিজ্ঞানী, তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেরা মেধাবীর স্বীকৃতিস্বরূপ কালী নারায়ণ স্কলার হিসেবে তার নামের শেষে কেএনএস লেখার অধিকার অর্জন করেন। ইউনুসের বিয়েতে শুধু তিনজন বরযাত্রী ছিল—আমি, ‘নোঙ্গর তোল তোল’ গানের গীতিকার নইম গহর এবং অধ্যাপক দীন মোহাম্মদ। দেড়-দুই মাস পূর্বে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাওয়ার পথে নিঃসন্তান ইউনুস মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যায়, তাকে তার বাড়ি নেত্রকোণার পূর্বধলায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভেঙে যাওয়া পা অপারেশন করে ঠিক করা হয়। অপারেশনের কিছুদিন পর থেকে সে লাঠি ভর করে হাঁটা শুরু করেছিল। প্রায় প্রতিদিন তার সাথে আমার কথা হতো, কিন্তু আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ একটু বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ২৪ মে থেকে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি, আমি সারা দিন হাসপাতালে ব্যস্ত ছিলাম বিধায় গত এক সপ্তাহে ইউনুসের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতাল থেকে ফেরত আসার পথে হাবিব ফোনে জানাল, ইউনুস আর নেই। এমন একটি সংবাদের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না, হতভম্ব হয়ে বাসায় ঢুকে বউ, মেয়ে, ছেলে, ভাতিজা, ভাই, বন্ধু-বান্ধব সবাইকে ইউনুসের মৃত্যুসংবাদ দিলাম। ফেইসবুক কর্তৃপক্ষ কয়েকদিনের জন্য তাদের ফেসবুকে আমার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করায় সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ইউনুসের মৃত্যুসংবাদ অনেককে জানাতে পারিনি।

সরকারের বিবেচনায় প্রখ্যাত সাংবাদিক না হলেও ইউনুস ছিল নীতিনিষ্ঠ, কোন প্রলোভনে সে নীতি-নৈতিকতা বিক্রি করেনি। পরকালে ইউনুস শান্তিতে থাকুক—এটাই আমাদের কামনা।