তীব্র সমালোচনার মুখে মুহাম্মদ আমির হামজার স্বাধীনতা পুরস্কার বাতিল করেছে সরকার। চলতি বছর সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য তার নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার দেওয়া হয়। আমির হামজাকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, তিনি সাহিত্যজগতে খুব বেশী পরিচিত নন। পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে এবং তার রচিত সাহিত্য সম্পর্কে সকলের মধ্যে জানার আগ্রহ ও কৌতূহল দেখা দেয়। আমির হামজার বাড়ি মাগুরার শ্রীপুরে, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি তাৎক্ষণিক গান রচনা করে তাতে সুরারোপ করে গাইতে পারতেন, তাই পালাগান কিংবা গীতিকবি হিসেবে নিজ এলাকায় তার পরিচিত আছে। মৃত্যুবরণ করেন ২০১৯ সনে। তিনি মাত্র তিনটি বই লিখেছেন; বই তিনটির নাম হচ্ছে, ‘বাঘের থাবা’, ‘পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব তুমি’ এবং ‘একুশের পাঁচালি’। সাহিত্য ক্যাটাগরিতে পুরস্কার বাতিলের আরেকটি ঘটনা ঘটে ২০২০ সনে; খুলনা বিভাগীয় সাবেক উপ-ভূমি সংস্কার কমিশনার এস এম রইজ উদ্দিন আহম্মদের নাম পুরস্কারের জন্য ঘোষণা করলেও তুমুল বিতর্কের একপর্যায়ে তার পুরস্কারও বাতিল করা হয়।

আমির হামজার ছেলে খুলনা জেলা পরিষদের সচিব মো. আছাদুজ্জামান সরকারের নির্ধারিত ফরম পূরণ করে পুরস্কারের আবেদন করেন এবং তাতে সুপারিশ করেন বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ। তপন কান্তি ঘোষ জাতীয় পুরস্কার দেওয়ার জন্য ১৬ জন সচিবের সমন্বয়ে গড়া ‘প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি’র সদস্যও। দুঃখজনক হচ্ছে, তপন কান্তি ঘোষ আমির হামজা সম্পর্কে কিছু না জেনেই সুপারিশ করেছিলেন। জাতীয় পুরস্কারসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র প্রধান ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকও প্রায় একই কথা বলেছেন। ২০২০ সনেও ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি সংস্কার বোর্ডের পক্ষ থেকে রইজ উদ্দিনের নাম প্রস্তাব করা হয় এবং ভূমি সংস্কার বোর্ড কোনোরূপ যাচাই-বাছাই না করেই ভূমি মন্ত্রণালয়ে সেই নাম পাঠিয়ে দেয়। স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে, জাতীয় পুরস্কারের জন্য যোগ্য ব্যক্তির নির্বাচন এবং যাচাই-বাছাইয়ে সরকারের সচিবদের নিয়ে গঠিত কমিটি অথবা মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত জাতীয় পুরস্কারসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অর্পিত দায়িত্ব পালনে যত্নবান নয়। প্রকৃতপক্ষে সচিব বা মন্ত্রীদের বেশীরভাগ সাহিত্যজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন, সারাদিন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং মিটিং করেই সময় পার করেন, তাদের পক্ষে সাহিত্যজগতের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা মোতাবেক মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং পূর্বে স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তরা নির্ধারিত যে কোনো ক্ষেত্রে পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করে থাকেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ১৬ সদস্যের ‘প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি’ প্রাপ্ত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে ‘জাতীয় পুরস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র নিকট উপস্থাপন করে। ১২ সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি পুনরায় তা যাচাই-বাছাই করে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করে। দেখা যাচ্ছে, উভয় কমিটিতে সরকারের সচিব এবং মন্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু শুধু আমলা এবং মন্ত্রীদের নিয়ে জাতীয় পুরস্কার কমিটি গঠনের যুক্তিসঙ্গত কোন কারণই থাকতে পারে না। সাহিত্যে পুরস্কার দেওয়া হবে, অথচ সংশ্লিষ্ট কমিটিতে দেশের প্রথিতযশা কোন সাহিত্যিক থাকবেন না, শুনতেই যেন বিদঘুটে মনে হয়। দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কারের জন্য যোগ্য ব্যক্তির নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় যোগ্য নির্বাচকও অপরিহার্য। আমলা এবং মন্ত্রীদের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তি নিশ্চয়ই আছেন, তাদের কমিটিতে রাখতে কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু কমিটির সকলেই আমলা বা মন্ত্রী হবেন কেন? দৈনন্দিন কাজের বোঝার মধ্যে তাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বোঝাও চাপিয়ে দেওয়া সমীচীন নয়। তাই পুরস্কার নির্বাচন কমিটিতে পরিবর্তন আনা দরকার, কমিটিতে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

পুরস্কারের জন্য ব্যক্তি নির্বাচনে শুধু কমিটি নয়, নির্বাচনপ্রক্রিয়ায়ও পরিবর্তন আনা দরকার। বর্তমানে পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হতে হলে নির্ধারিত আবেদন-ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট সচিব, মন্ত্রী বা আগের পুরস্কারপ্রাপ্তদের সুপারিশ নেয়া অপরিহার্য। এই প্রক্রিয়ার সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অবদানের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক মূল্যায়িত হয় অধিক। সম্পর্কের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে যোগ্যতার বিচার অবমূল্যায়িত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু পুরস্কারের জন্য আবেদন করতে হবে কেন? আবেদন করলেই যে পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই আবেদন করে কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি পুরস্কার নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করার কথা নয়। তাহলে কি নিভৃতচারী কোনো নির্মোহ লেখক কখনোই পুরস্কার পাবেন না? যারা পুরস্কারের জন্য আবেদন করেন তারা সত্যিই কি যোগ্য ব্যক্তি? সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হলে তারাই উপযুক্ত ও যোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে নেবেন।

অনুসৃত প্রক্রিয়ায় পরিলক্ষিত হয়, কোন কোন বিদগ্ধ ব্যক্তি স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার সবই পাচ্ছেন; কেন একই ব্যক্তি সব পুরস্কারে ভূষিত হবেন? স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার মতো অগণিত যোগ্য লোক এখনো জীবিত আছেন। স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন বাজি রেখে মরণপণ যুদ্ধ করেছিলেন, যারা মুজিবনগর সরকার পরিচালনা করেছিলেন, যারা স্বাধীনতার পক্ষে কলম ধরেছিলেন, যারা পাকিস্তান দূতাবাস ত্যাগ করে মুজিবনগর সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন, যারা গান গেয়ে বা নাটক করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন, যারা ফুটবল খেলে মুক্তিযুদ্ধের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন তারা সবাই স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য যোগ্য। কিন্তু সবাইকে একত্রে বিবেচনা করা সম্ভব নয় বিধায় অবদানের অগ্রাধিকার বিবেচনায় স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া সমীচীন ও বাঞ্ছনীয়।

পদক-পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পান; কিন্তু মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া অনেকটা অর্থহীন। ব্যক্তির জীবদ্দশায় পুরস্কার দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার নিজের অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সম্পর্কে জেনে যেতে পারল না, একটা অতৃপ্তি নিয়ে চলে গেল। নোবেল পুরস্কার মৃত ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না। অতি সম্প্রতি একজনকে মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। নোবেল কমিটি নোবেল দেওয়ার জন্য ঐ বিজ্ঞানীকে মনোনীত করে তার সাথে যোগাযোগ করতে গিয়ে পরিবার থেকে জানতে পারে তিনি তিন দিন আগে মারা গেছেন। মরণোত্তর দেওয়া গেলে জীবিত থাকাকালীনও দেওয়া সম্ভব যদি যোগ্য ব্যক্তিদের নিরপেক্ষভাবে বিচার করা হয়। কিন্তু সব সরকারের আমলে পুরস্কার দেওয়ার জন্য নিজেদের লোক খোঁজা হয়। অতীতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দলীয় সমর্থককে পুরস্কৃত করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তাই সম্ভবত পুরস্কার কমিটি সরকারের আমলা এবং মন্ত্রীদের নিয়ে গঠন করা হয়। অবশ্য বুদ্ধিজীবীরাও দলীয় মতাদর্শে বিভাজিত। তবে দলীয় লোক গুণী হলে সমস্যা হয় না, এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নিরূপণে শুধু স্বজনপ্রীতি হয়। কিন্তু তাই বলে স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিকে যখন ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দেওয়া হয় তখন তা সকল বিবেচনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী মাহবুবুল আলম চাষীকে পুরস্কৃত করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সনে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রবর্তন করেন। শুধু তাই নয়, ১৯৮০ সনে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শর্ষিনার পীর আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহকেও জিয়াউর রহমানের সরকার স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। এদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে ‘নিজেদের লোক’ বিবেচনায়। এমন বিবেচনা সব সরকারের আমলেই হচ্ছে। দেশ যেভাবে মতাদর্শে বিভাজিত তাতে দল-মত নির্বিশেষে যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন সম্ভব বলে মনে হয় না। দলপ্রীতি থাকবেই। তবে অন্তত দলের যোগ্য ব্যক্তিকে পুরস্কারের জন্য বেছে নেয়া হলেও পুরস্কার ও পদকগুলোর সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।

উপযুক্ত ও যোগ্য ব্যক্তিকে পুরস্কার না দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়া হলে পুরস্কারের মর্যাদা হ্রাস পায়। ইতঃপূর্বে সাহিত্য ক্যাটাগরিতে যারা স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছেন, কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, কবি শামসুর রাহমান, জহির রায়হান, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, শওকত ওসমান, শহীদুল্লাহ কায়সার, কবি ফররুখ আহমদ, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। কিন্তু স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার মতো সাহিত্যকর্ম আমির হামজার নেই, তার কোন বই সাহিত্য ও শিল্পের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। এছাড়াও তিনি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী, বিএনপি’র শাসনামলে রাজনৈতিক বিবেচনায় সাধারণ ক্ষমার আওতায় তিনি ১৯৯১ সনে মুক্তি পান। এতদসত্ত্বেও তাকে বাছাই করার অন্যতম কারণ সম্ভবত তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান রচনা করে কমিটির নজরে আসতে সমর্থ হয়েছেন। কিন্তু আমির হামজা যে জিয়াউর রহমানকে নিয়েও গান লিখেছেন তা সম্ভবত কমিটি জানতে পারেনি। যখন জানলেন তখন দেওয়া পুরস্কার বাতিল করা ফরজ হয়ে গিয়েছিল।

পুরস্কার দিয়ে তা বাতিল করা পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য অসম্মান ও অপমানজনক। পুরস্কার পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনায় আঘাত করার অধিকার কোন পুরস্কার প্রদান কমিটির থাকার কথা নয়। রইজ উদ্দিন এবং আমির হামজা দুইজনই বীর মুক্তিযোদ্ধা, তারা বা তাদের পক্ষে পুরস্কারের জন্য আবেদন করে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তথ্যের উপযুক্ততা এবং সত্যাসত্য যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কমিটির। কমিটিতে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ না থাকার দায় রইজ উদ্দিন বা আমির হামজা নেবেন কেন? স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের জন্য কারো নাম ঘোষণার পর সমালোচনার মুখে সেই নাম প্রত্যাহার করে নিলে পুরস্কারটিকেই অসম্মান ও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুর পরে অসম্মানিত করার দায় সংশ্লিষ্ট কমিটিকে নিতে হবে। তাই আমির হামজার পুরস্কার বাতিল করার সাথে সাথে সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ে গঠিত সংশ্লিষ্ট কমিটি দুইটিও বাতিল করা অপরিহার্য।