ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পায়রা চত্বরে কাওয়ালি সংগীতের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সংগঠন ‘সিলসিলা’র আয়োজন পণ্ড করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কর্মীরা এই অনুষ্ঠান পণ্ড করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রলীগ বলছে গান, বাদ্যযন্ত্র, অনুষ্ঠানে মেয়েদের অংশগ্রহণ ইত্যাদি নিয়ে শরিয়াহ ও তরিকা বিচারে আয়োজকদের মধ্যে যে বিভেদ ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অনুষ্ঠান পণ্ডের মধ্য দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ অনুষ্ঠান পণ্ডের নিন্দা এবং প্রতিবাদ করেছেন, আবার অনেকে পণ্ড করার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক স্পষ্ট ঘোষণা করে ঘোষণা দিয়েছেন, কাওয়ালি শুনলে সওয়াব হাসিল হবে না, বাদ্যযন্ত্রের বাহারি ব্যবহারে এই গানে শিরক-বেদাতের ছড়াছড়ি রয়েছে। এছাড়াও অনেক আলেম বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, কাওয়ালি গান নাজায়েজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষ-বিপক্ষের বক্তব্য পড়ে মনে হলো কাওয়ালি নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা হয়েছে আয়োজকদের নিয়ে। অনেকের মতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলো ইসলামী শাসনতন্ত্র, হিযবুত তাহ্‌রীর এবং ছাত্র অধিকার পরিষদ। অনুষ্ঠান পণ্ড হওয়ার পর কেউ কাওয়ালিকে বলছেন শিরক-বেদাত, কেউ বলছেন কাওয়ালি গানের আড়ালে রাজনৈতিক খেলার আয়োজন, কেউ বলছেন এই অনুষ্ঠান ছিলো একটি সাধারণ গানের আসর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথমে এই অনুষ্ঠানের অনুমতি দিলেও করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়াতে তা স্থগিত রাখতে আয়োজকদের অনুরোধ করেছিলো, আয়োজকেরা অনুরোধকে গুরুত্ব দেননি।

কাওয়ালি গান শোনার প্রতি সাধারণ ধার্মিক লোকের প্রচুর আগ্রহ, কারণ কাওয়ালি শব্দটি আরবি ‘কওল’ থেকে এসেছে, কাওয়ালি সুফি সম্প্রদায়ের গান। সুফী সাধকগণ আধ্যাত্মিক প্রেম-অনুভূতির অনুরণন খুঁজতেন এই গানে। জানা যায়, হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রা.) এই গানের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তার শিষ্য নিজামুদ্দিন আউলিয়ার (র.) দরবারেও কাওয়ালির আসর বসতো। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার (র.) শিষ্য হযরত আমির খসরু (র.)-কে কাওয়ালি গানের জনক বলা হয়। ভারত এবং পাকিস্তান এই সঙ্গীতের প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশে এই গান খুব বেশি জনপ্রিয় নয়, তবে পুরান ঢাকার আদিবাসীদের মধ্যে এই গানের প্রচলন রয়েছে। পুরান ঢাকার কাওয়ালেরা আমন্ত্রিত হয়ে বিভিন্ন জলসা বা বিয়ের অনুষ্ঠানে এই গান পরিবেশন করে থাকেন। প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসার মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে সুফি ধারায় নাচ-গানের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কাওয়ালি তো ভারতীয় উপমহাদেশের একটি জনপ্রিয় সঙ্গীতধারা। ভারত উপমহাদেশে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো সুফি সাধকদের মাধ্যমে। ধর্মান্তরে এরা জোর খাটায়নি, প্রচার করেছে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের সহজ পদ্ধতি। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলে সুফি সাধকদের দরবারে এসে তাদের কথা শুনতো। তাই কাওয়ালি গানের ভক্তদের সাথে উগ্রপন্থীদের সম্পর্ক থাকার কথা নয়; কারণ কাওয়ালরা সাম্প্রদায়িক নন, তারা ধর্মের ব্যাপারে উদার, উগ্রবাদীরা এই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচরণের বিরুদ্ধাচারণ করে থাকে।

কাওয়ালি গানের আসর মূলত শুরু হয় ভক্তিমূলক হামদ এবং না'ত দিয়ে। কাওয়ালি গানের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণ হতে পারে এই গান মূলত উর্দু ভাষায় গাওয়া হয়। রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার জেদ ছিলো পাকিস্তানি শাসকদের, জোর করে স্কুলে উর্দু শেখানো হতো। ১৯৫২ সনে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালিরা প্রাণও দিয়েছে। তখন স্বাভাবিক কারণে উর্দুর প্রতি বাঙালিদের একটা আক্রোশ ছিলো, সেই আক্রোশ তো এখন থাকার কথা নয়। তবে কাওয়ালি গানের আসর বসিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসের ঠিক পূর্বক্ষণে ভাষাশহীদদের অপমান করার ইচ্ছা পোষণ করলে তার প্রতিবাদ হতে পারে; কিন্তু প্রতিবাদ হবে কাগজে-কলমে, মিছিলে-স্লোগানে, অনুষ্ঠান পণ্ড করে নয়। যারা পণ্ড করেছেন তাদের যুক্তি অনুষ্ঠান পণ্ড করার পর বিভিন্ন জনের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, কিন্তু তারা তো পণ্ড করার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কাওয়ালি অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ করে জনমত সৃষ্টি করতে পারতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সতেরটি ভাষা জানতেন বলে আমাদের স্কুলে পড়ানো হয়েছে, তার মধ্যে নিশ্চয়ই উর্দু ভাষাও ছিলো।

ব্রিটিশ আমলের গোড়ার দিকে মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যম ছিল উর্দু, কারণ তখন হাদিস, ফিকাহ, তাফসির প্রভৃতি উর্দু ভাষায় লেখা হতো। এক সময় বাংলাদেশের মুসলিম অভিজাত শ্রেণির ভাষা ছিলো উর্দু। ভাষা কারো শত্রু নয়। উর্দু ভাষায় রচিত সমৃদ্ধ সাহিত্যও রয়েছে। ভাষা না বুঝলেও আমরা উর্দু গান শুনি, উর্দু সিনেমা দেখি। হাল আমলে বাংলাদেশের শিল্পী রুনা লায়লা এবং বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আলমগীরের উর্দু গান সবাই আগ্রহ নিয়ে শুনেন। একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নূরজাহান বা গজলসম্রাট মেহেদীর গান ছাড়া পুরাতন ঢাকার রেস্তোরাঁর কথা ভাবাই যেত না। উপমহাদেশের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম গায়ক ও সুরস্রষ্টা ছিলেন মেহেদী হাসান খান। নূরজাহানকে সর্বকালের সেরা সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে মনে করা হয়। লতা না নূরজাহান—কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়েও এক সময় জোর বিতর্ক চলতো। নূরজাহানের একটি গানের বিনিময়ে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান বিক্রি করে দিতেও রাজি ছিলেন বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল। অন্যদিকে হিন্দি গান তো আমরা অহরহ শুনি। লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, শামসাদ বেগমের গান না থাকলে আজও হলুদ-সন্ধ্যা জমজমাট হয় না, মেয়েদের কোমর দুলে না। মোহাম্মদ রফি ছাব্বিশ হাজারেরও অধিক চলচ্চিত্রের গানে নেপথ্য গায়ক ছিলেন। শামসাদ বেগমের ‘লেকে পেহলা পেহলা প্যায়ার, ভার কে আঁখো মে কুমার’ বা ‘সাইয়া দিলমে আনা রে’ প্রভৃতি গান পুরান ঢাকার রেস্তোরাঁগুলোতে এখনো বাজে, যাদের কানেই যায় তারা মাথা নাড়িয়ে বা নিচু স্বরে গেয়ে রেসপণ্ড করে থাকেন।

কাওয়ালি একধরনের ইসলামি ভক্তিমূলক গান। ভাষাকে ধর্মের সাথে একাকার করে ভাবনার উদ্ভব হলে সমস্যা নতুন করে বারবার জেগে উঠবে। উগ্র ধর্মান্ধরা সুফিবাদ সহ্য করতে পারে না, কারণ কাওয়ালি জলসা বলতেই মানুষ বোঝে ধর্মীয় জলসা। ২০১৬ সনে পাকিস্তানের বিশ্বখ্যাত কাওয়াল আমজাদ সাবরিকে করাচিতে পাকিস্তান তালেবানেরা হত্যা করেছে। সুফিবাদের সঙ্গে কাওয়ালির সম্পর্ক নিবিড়। পাকিস্তানের তালেবান সুফিবাদের চরম বিরোধী। আমাদের দেশে অনেক বাউল সাধককেও উগ্র ধর্মান্ধরা হত্যা করছে, নির্যাতন থামছে না। নির্বিরোধী এই মানুষগুলোর আসরঘর, আখড়া রাতের আঁধারে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে দুর্বৃত্তেরা। সুন্দর ও পবিত্র বাউল গানে জাত-পাতের উচ্ছেদের কথা উচ্চারিত হয়, ধর্মের নামে অধর্মের অবসায়নে মানবধর্ম প্রতিষ্ঠার জয়গান হয়। বাউলদের ধর্মচ্যুত আখ্যা দিয়ে তাদের চুল-দাড়ি কাঁচি-দা দিয়ে কেটে ফেলার মহোৎসবও হয়েছিলো। ২০১৪ সনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লালনভক্ত শফিউল আলমকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের দুর্ভোগের কথা পরে না হয় আরেকদিন বলব।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড করে উগ্র ধর্মান্ধদের সহযোগিতা করা সমর্থনযোগ্য নয়। জঙ্গিবাদের উত্থানে সরকার যখন নমনীয় ছিলো তখন সাংসদ মমতাজ বেগম স্পিকারের কাছে দেশের সর্বত্র গান গাওয়ার নিরাপত্তা চেয়ে সংসদে বক্তব্য দিয়েছিলেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আস্তে আস্তে টেলিভিশন বা বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, এখন আর গ্রামের স্কুল বা কলেজ মাঠে নাটক মঞ্চস্থ হয় না, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না। গ্রামে এখন এমন অনুষ্ঠান করতে গেলে মারাত্মক প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে। অবশ্য মানসিকভাবেও আমরা এখন আর নাচ-গান-নাটক আগের মতো পছন্দ করছি না, সকালে হারমোনিয়াম নিয়ে সন্তানদের গান শিখতে উৎসাহিত করছি না। কাওয়ালি মানবসমাজের সংস্কৃতির অঙ্গ; সারা দেশে সব জায়গায় কাওয়ালি হবে না কেন? কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত, গণসঙ্গীত, ব্যাণ্ড সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, বাউলগান, লোকসঙ্গীত—সব ধরণের গানের অনুষ্ঠান হওয়া সমীচীন হবে।