আজ রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
ডিজেলের দাম ও ধর্মঘট
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার প্রতিবাদে গণপরিবহন এবং পণ্য পরিবহনে ধর্মঘট পালনে জনগণকে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। ধর্মঘটের প্রথম দিন বাড্ডা বাসস্ট্যাণ্ডে গিয়ে অসংখ্য লোককে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, সবাই বাসের প্রত্যাশায় টিভি সেন্টারের দিকে বারবার তাকাচ্ছে। আমি উত্তরা যাব, বিআরটিসি’র একটি দোতলা বাস আসার সাথে সাথে বাসে উঠার জন্য সবাই ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিল, কিন্তু একটু পরে বাসে উঠেও অনেকে আবার নেমে গেল। জিজ্ঞেস করে জানলাম, উত্তরার ভাড়া দেড়শত টাকার কথা শুনে তারা নেমে গেছে। বিআরটিসি’র বাসগুলো এখন আর সরকারের ব্যবস্থাপনায় চলাচল করে না, চুক্তিভিত্তিক বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাই ২০ টাকার ভাড়া দেড়শ টাকা। এমন অরাজকতা পৃথিবীর আর কোথাও সম্ভবত নেই। আগের তুলনায় দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে সিএনজি করে উত্তরা গেলাম।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়াও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়—এটা নতুন কোন বিষয় নয়। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে শুধু পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পায় না, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির সাথে সাথে সকল পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পায়। আজকাল জমি চাষ, পানি সেচ, চারা রোপণ, ধান কাটা ও মাড়াইকরণে ডিজেলচালিত যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক কিংবা নৌযানেও লাগে ডিজেল। পোশাক কারখানার জেনারেটর ও বয়লার, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, মাছ ধরার ট্রলারগুলোও চলে ডিজেলে। ডিজেলের বর্ধিত খরচের এক পয়সাও যন্ত্রের মালিক বা পরিবহন মালিকেরা বহন করবে না, করবে আমাদের মতো ভোক্তারা। ধর্মঘট ডাকার হেতু হচ্ছে গাড়ি ভাড়া বাড়ানো। তাদের দাবী অন্যায্য নয়; কিন্তু ধর্মঘটের মহড়া দিয়ে তারা অন্যায্যভাবে ২৭ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছে, অথচ ডিজেল ও কেরোসিন তেলের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ। প্রতি লিটার ডিজেলে ১টি বাস বা ট্রাক ৩ কিলোমিটার চললে ৫০ জন যাত্রীর একটি বাসে প্রতি জনে প্রতি কিলোমিটারে খরচ বাড়ে মাত্র ১০ পয়সা। অন্যদিকে একটি ৫ টনের ট্রাকে ১০০ কিলোমিটারে ১ কেজি পণ্যের দাম বাড়বে মাত্র ১০ পয়সা। কিন্তু এই উছিলায় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে কেজি প্রতি ৫/১০ টাকা। এছাড়াও যে সকল বাস-ট্রাক ডিজেলে চলে না, গ্যাসে চলে, সে সকল বাস-ট্রাকের ভাড়াও বেড়ে যাবে। এখন সকল বাস, ট্রাকে গ্যাস দেওয়া বন্ধ করা দরকার।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দেশের অর্থনীতি এমনিতেই সংকুচিত অবস্থায় রয়েছে। অর্থনীতির এই নাজুক অবস্থায় ডিজেলের দাম বাড়ানো অর্থনীতির স্বার্থেই উচিত হয়নি। কারণ করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে এক বছর ভর্তুকি বা লোকসান দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা গেলে জিনিসপত্রের দাম সহনশীল অবস্থায় রাখা সম্ভব হতো। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সার্বিক অর্থনীতিতে চাপ পড়ার হিসাব সরকারের কাছে থাকা সত্ত্বেও সরকার ভর্তুকি দেওয়ার দিকে পা বাড়ায়নি। কিন্তু অতীতে বহুবার জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিয়েছে এবং ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনেই সরকার জ্বালানি তেলের ব্যবসা নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। অবশ্য ভর্তুকি দিয়ে ডিজেলের দাম কম রাখলেও বিপদ, আমদানি করা ডিজেল প্রতিবেশী দেশ ভারতে বেশী দামে পাচার হয়ে যায়। কারণ ভারতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম গড়পড়তা ৯০ রুপি বা ১০৪ টাকা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা
বিপিসি’র বিগত ৫/৬ বছরের বিপুল লাভ দিয়ে বর্তমানের বর্ধিত দর সমন্বয় না করায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। বিপিসি বিগত কয়েক বছর লাভ করলেও সারা জীবন তাদের লোকসান দেওয়ার কথাই শুনেছি। এই বছরের জুন মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিপিসি লোকসান দিয়েছে। সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, কৃষি প্রভৃতি খাতে ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই মুহূর্তে সরকারের ডিজেল ও কেরোসিনে ভর্তুকি দেওয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত। সরকারের টাকা আসে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, টোল, সরকারের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আয়, জনগণ ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়ের উপর কর আদায় থেকে। এই আদায় থেকেই সরকারকে তার কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি দিতে হয়, শিক্ষা-কৃষি-স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি দিতে হয়, রাস্তাঘাট বানাতে হয়, কালভার্ট-ব্রিজ তৈরি করতে হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে হয়, কর্মহীন প্রবীণ ও সহায়সম্বলহীন লোকদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আর্থিক সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, বিনে পয়সায় করোনা ভ্যাকসিনেরও ব্যবস্থা করতে হয়।
করোনার সময় ব্যবসা-বাণিজ্য হ্রাস পাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমেছে; আয় কমলে সরকারের ব্যয়ও কমবে। ব্যয় কমাতে না চাইলে সরকারকে দেশে-বিদেশে ঋণ করতে হবে, মাত্রাতিরিক্ত ঋণ করলে মুদ্রাস্ফীতি হবে, জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। অন্যদিকে করোনায় সৃষ্ট মন্দা ও স্থবির অর্থনীতি থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন সেক্টরে সরকারকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হয়েছে। আয় করেও লোকজন আয়কর দিতে চায় না, ধার্মিক হয়েও কর প্রদানে মিথ্যে তথ্য দিয়ে থাকে। আমাদের দেশে কর ফাঁকি বেশী বলেই জর্দা কোম্পানি বারবার সর্বোচ্চ করদাতা বিবেচিত হয়ে থাকে। কর ফাঁকি দেওয়া হয় বলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকে অপ্রদর্শিত অর্থ জরিমানা দিয়ে বৈধ করতে হয়েছিলো। কিছু ব্যবসায়ী আমদানি-রপ্তানিতে ওভার ইনভয়েস, আণ্ডার ইনভয়েস করে শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে, দেশের টাকা বিদেশে পাচার করছে। সরকারের কর বিভাগের কিছু লোকের অসততায় কর ফাঁকির ঘটনা অগুনতি। এলএনজিতে গত ছয় মাসে ১০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি লেগেছে; অথচ এই সেক্টরে চাকুরী করে অনেক করণিকেরও কোটিপতি হওয়ার খবর শোনা যায়।
অনেকে বলছেন, ডিজেলের দাম না বাড়িয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই ক্ষেত্রে শুল্ক মওকুফ করতে পারতো। কিন্তু শুল্ক কমালে সরকারে রাজস্ব আদায় কম হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কোন জিনিসের দাম বেড়ে গেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে প্রায়ই শুল্ক মওকুফ করতে হয়, কিছুদিন আগে পেঁয়াজে তা করতে হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভোজ্যতেল, চিনি, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে গেছে। জনগণের কথা চিন্তা করে এই সকল পণ্যের ক্ষেত্রেও শুল্ক মওকুফ করা হলে সরকারের রাজস্ব আদায় আরও কমে যাবে। সরকারের আয় কমে গেলে ব্যয়ও কমে যাবে। ব্যয় কমে গেলে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা কাটছাঁট করতে হবে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা ব্রিজ বা মেট্রোরেলের মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের চিন্তা বাদ দিতে হবে, অথবা নিয়ম না মেনে নির্বিচারে জনতা, বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিদেশ থেকে যখন-তখন ঋণ নিতে হবে। সরকার উভয় সঙ্কটে, ভর্তুকি না দিলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, আবার ভর্তুকি দিলে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা কাটছাঁট করতে হবে। লিটার প্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি অনেক বেশী, কিন্তু তবুও জিনিসপত্রের দর খুব বেশী বাড়ার কথা নয়। ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে কেউ যেন অতিরিক্ত মুনাফা বা আয় করতে না পারে সেদিকে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি অপরিহার্য।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com