প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৫৬ এএম

তালেবান শাসনে শরিয়া আইন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

আফগানিস্তানের সদ্যঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘শরিয়াহ আইন’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। তালেবানদের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের জিহাদি সংগঠনগুলো আতশবাজি পুড়িয়ে, মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ-উল্লাস করেছে। শুধু জিহাদি সংগঠন নয়, আমাদের দেশের ইসলামপন্থী সংগঠনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরাও তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে প্রকাশ ও প্রচার করছে।

আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে সরকার গঠনের পর তালেবানেরা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে যে, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়, দেশ শাসন ও পরিচালনায় শরিয়াহ বা ইসলামী আইন কঠোরভাবে অনুসৃত হবে। তালেবানরা ঘোষণা দিয়েছে, ইতিপূর্বে অন্য দেশের সঙ্গে যে সব চুক্তি হয়েছে সেই সকল চুক্তি শরিয়াহ আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে বাতিল করা হবে। তালেবান মন্ত্রিসভায় কোনো নারী সদস্য না থাকায় প্রশ্ন উত্থাপিত হলে তালেবানদের পক্ষ থেকে বলা হয়, নারীরা মন্ত্রণালয় চালানোর যোগ্যতা রাখে না; মন্ত্রী হওয়া নারীর কাজ নয়, নারীর কাজ হচ্ছে সন্তান জন্ম দেওয়া। তালেবানদের অভিমত, যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকারের আমলে অফিসে যা হয়েছে তা পতিতাবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। ইতিমধ্যে তালেবান শিক্ষামন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামি আইন অনুযায়ী ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়েছেন, প্রয়োজনীয় নারী শিক্ষক না থাকা সত্ত্বেও পুরুষ শিক্ষক দিয়ে নারীদের শিক্ষাদান নিষিদ্ধ করেছেন, তবে প্রবীণ পুরুষ শিক্ষককে নারীদের শিক্ষাদানে অনুমতি দেওয়া হবে।

শরিয়াহ আইন হলো পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বিধান এবং ইসলামি পণ্ডিতদের দেওয়া ফতোয়া। শরিয়াহ আইনে অপরাধগুলোকে যে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, তাদের একটি হলো ‘হুদুদ’ বা মারাত্মক অপরাধ। হুদুদ অপরাধের শাস্তি কোরআন এবং হাদিসে উল্লেখ করা আছে; যেমন, প্রমাণিত চুরির অপরাধে হাত বিচ্ছিন্ন করা, ব্যভিচারের জন্য প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করা এবং পাথর ছুড়ে হত্যা করা। বেশিরভাগ মুসলিম দেশে বিয়ে, তালাক, খোরপোষ, উত্তরাধিকার, শিশুর তত্ত্বাবধায়ক ইত্যাদি ক্ষেত্রে শরিয়াহ আইন অনুসৃত হলেও চুরি, ব্যভিচার ইত্যাদি অপরাধমূলক বিচারব্যবস্থায় হুদুদ শাস্তিবিধান বাস্তবায়ন করা হয়নি। শরিয়াহ আইনে কিসাস হচ্ছে চোখের বদলে চোখ, জানের বদলে জান। রক্তমূল্য দিয়ে এই শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে তাজির অপরাধের শাস্তির বিষয়ে কোরআন বা হাদিসে নেই। ঘুষ, দুর্নীতি, সুদ খাওয়া, জুয়া খেলা ইত্যাদি অপরাধের শাস্তির মাত্রা বিচারকের বিবেচনাবোধের ওপর নির্ভর করে। মনে হয়, এই আইনগুলো সাধারণ আইনের মতো মানবরচিত।

শরিয়াহ আইনের প্রবর্তন ধর্মের প্রতি আনুগত্যের কারণেই শুধু হয় না, ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার ইচ্ছে থেকেও চালু করা হয়। অধিকাংশ মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে স্বৈরশাসক বা রাজা-বাদশাহরা ক্ষমতায় থাকার অভিপ্রায়ে শরিয়াহ আইন প্রবর্তন করে ধার্মিকদের সন্তুষ্ট রাখেন এবং একবার চালু হয়ে গেলে তার বিরোধিতা মানেই ‘মুরতাদ’, আর মুরতাদ হলেই শরিয়াহ আইনে শিরশ্ছেদ এবং এভাবেই সিংহাসন বংশপরম্পরায় নিরাপদ থাকে। সৌদি আরব, ওমান, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ইরান, লিবিয়া প্রভৃতি মুসলিম দেশে বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠন বা সরকারবিরোধী আন্দোলনের কোনো সুযোগ নেই। শুধু রাজ-বাদশাহরাই নয়, শরিয়া আইনও গণতন্ত্রের বিরোধী। কারণ শরিয়া আইনের বিরোধিতা করে ভিন্ন মত বা আদর্শ নিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। এ জন্যই যে সকল দেশে শরিয়া আইন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেই সকল দেশে বিভিন্ন মত ও আদর্শের বহুদলীয় রাজনীতি থাকতেই পারে না। যারাই রাজনীতি করবেন তাদের শরিয়া আইন মেনে রাজনীতি করতে হবে; ১৮ দফা বা ১৯ দফার রাজনীতি করা যাবে না।

বিশ্বের যে দেশগুলোতে শরিয়া আইন রয়েছে তার মধ্যে পাকিস্তান, মিসর, ইরাক, ইরান, সোমালিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব অন্যতম। ইরানে শরিয়া আইনের বাস্তবায়ন হয়েছে, সেখানে নির্বাচনে ইচ্ছে করলেই যে কেউ রাষ্ট্রপতি বা ২৯০ সদস্যবিশিষ্ট মজলিশের (সংসদ) জন্য প্রার্থী হতে পারেন না, ইরানে ছয় জন মওলানা আর ছয় জন আইনজ্ঞ নিয়ে গঠিত ‘অভিভাবক পরিষদ’ প্রার্থী বাছাই ও অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করে থাকে। ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত মজলিশের নির্বাচনে ‘অভিভাবক পরিষদ’ ৭ হাজারেরও বেশি উদারপন্থী এবং সংস্কারবাদী সম্ভাব্য প্রার্থীকে ভোটে দাঁড়ানোর অনুমতি দেয়নি। সরকারের অবলম্বিত নীতি-আদর্শের বিপক্ষে সামান্য উচ্চারণ করা হলেও তার শাস্তি ভোগ করতে হয়। সরকারের সমালোচনা করায় ইরানের প্রেসিডেন্ট বনি সদরকে গোপনে দেশ ত্যাগ করে জীবন বাঁচাতে হয়েছে। এই ইরান আবার সৌদি রাজতন্ত্রের কঠোর সমালোচক; সৌদি আরবে রাজনৈতিক দল নেই, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনাকে সহ্য করা হয় না; সৌদি আরবে শরিয়াহ আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। তবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আস্তে আস্তে শরিয়াহ আইন শিথিল করে পাশ্চাত্যের পর্যটকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।

সোমালিয়ায় কঠোরভাবে শরিয়াহ আইনের প্রয়োগ হয়ে থাকে; এমনকি অমুসলিমদের জন্যও শরিয়াহ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের প্রচার সেখানে নিষিদ্ধ, ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় সোমালিয়ায় ২০১৫ থেকে খ্রিস্টানদের বড়দিন এবং নববর্ষ উদযাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জেহাদী গোষ্ঠী আল শাবাবও তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইসলামি শরিয়া আইন বলবৎ করেছে। সোমালিয়ার জলদস্যুরাই তাদের সমুদ্র প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত, এই দেশটি সশস্ত্র গোষ্ঠী শাবাবের নিয়মিত আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত, প্রতিনিয়ত দেশটিকে দুর্ভিক্ষের মোকাবেলা করতে হয়, বিভিন্ন গোত্র বা সেনাদের শাসনে বিপর্যস্ত দেশটি বাংলাদেশ থেকেও ঋণ নিয়েছে।

পাকিস্তানে জিয়াউল হক শরিয়াহ আইন প্রবর্তন করলেও তার বাস্তবায়ন এখনো সম্ভব হয়নি; সেখানে ধর্ষণ এবং ব্যভিচারের বিচারের ব্যবস্থা একই শরিয়াহ আইনে থাকায় এই প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা এসেছে। কারণ ব্যভিচার বা ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণের জন্য ৪ জন ভালো চরিত্রের চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী ছাড়া অন্য কোন প্রমাণ গ্রহণযোগ্য নয়, হাজার মহিলা সাক্ষীতেও কাজ হয় না, এমনকি ধর্ষণের বেলায় মেডিকেল বা ডিএনএ টেস্টও প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যায় না। হুদুদ মামলায় নারী ও অমুসলিমদের সাক্ষ্য অস্বীকার করা হয় বিধায় আজ পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, ৪ জন পুরুষের সম্মুখে একটি লোক ধর্ষণ বা ব্যভিচার করতে পারে না, যদি পারে তাহলে বুঝতে হবে সাক্ষী ৪ জন সৎ ও ভাল নয়।

ইন্দোনেশিয়ার ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে শুধু আচেহ প্রদেশেই আইনগত বৈধভাবে শরিয়া শাসন রয়েছে। মালয়েশীয়ায় ইসলামি শরিয়াহ আইনের পাশাপাশি সিভিল আইনও রয়েছে। মুসলিম-অধ্যুষিত সুদানে ১৯৮৯ সনে শরিয়াহ আইন প্রবর্তনের পর দেশটি একদলীয় শাসনে পরিণত হয়েছিল, সম্প্রতি সুদান আবার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করেছে; এখন সুদানে নারীর যৌনাঙ্গচ্ছেদ করা হয় না, ইসলাম ত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রহিত করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও একই অবস্থা, দীর্ঘদিন শরিয়া আইনের কঠোর বাস্তবায়নে দেশটি রক্ষণশীল ছিল। শরিয়াহ আইন শিথিল করে আরব আমিরাতে এখন লিভ টুগেদার এবং মদ্যপানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ব্রুনেইর রাজতন্ত্রে সুলতান সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। ১৯৮৪ সনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর সুলতান ক্রমশ ব্রুনেইকে ইসলামি কঠোর নিয়মকানুনের দিকে নিয়ে যান। সেখানে কোনো বিরোধী দল নেই, ভিন্নমতের কোনো জায়গা নেই। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি পাথর ছুড়ে মারার মতো কঠোর শাস্তি বন্ধ করে দিয়েছেন সুলতান। মদ্যপান, ধূমপান কিংবা সংগীত ও নাচের আনন্দ উপভোগ করতে ব্রুনেইর লোকজন নিয়মিত মালয়েশিয়ায় চলে যায়। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপসহ আরও কয়েকটি দেশে শরিয়াহ আইন থাকলেও বিদেশি পর্যটকদের জন্য মদ সহজলভ্য, বিকিনি পরে সমুদ্রতীরে যাওয়া যায়।

প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত বা পাথর ছুড়ে হত্যার বিধানটি অমানবিক, অবমাননাকর ও নিষ্ঠুর বিবেচনায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন কঠোর সমালোচনা করে থাকে। মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কারো কোনো বক্তব্য নেই, বক্তব্য আছে তা কার্যকর করার প্রক্রিয়া নিয়ে—জনসমক্ষে শিরশ্ছেদ করা বা পাথর মেরে হত্যা করা নিয়ে বিশ্বে প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংগঠনের সমালোচনাকে অগ্রাহ্য না করে কিছু মুসলিম দেশ শরিয়া আইন বলবৎ থাকা সত্ত্বেও হুদুদ অপরাধের শাস্তি প্রদানে লুকোচুরি করে। আফগানেরা বিশ্বের সমালোচনার তোয়াক্কা করবে বলে মনে হয় না। তোয়াক্কা করার কথাও নয়, সমালোচনার ভয়ে কিছু লোক ধর্মকে আধুনিকায়ন করতে চায়, যা ধর্মের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

সাবেক নির্বাহী পরিচালক

বাংলাদেশ ব্যাংক

https://shampratikdeshkal.com/opinion/news/210957828/%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%86%E0%A6%87%E0%A6%A8?fbclid=IwAR3C6khNbKa2cO6MMdcFdj7DAGyQlXHXM8bHv78gRs_tUT9e0yNU1Xiu7N4