আজ রবিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
ভুঁইফোড় সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
হেলেনা জাহাঙ্গীরের গ্রেপ্তার ঘটনায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। হেলেনার বিরুদ্ধে অপরাপর অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মানহানি ও সুনাম নষ্ট করেছেন। হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। হেলেনা জাহাঙ্গীর মূলত একজন নারী উদ্যোক্তা; তিনি শীর্ষ নারী উদ্যোক্তার পুরস্কারও পেয়েছিলেন। হেলেনা জাহাঙ্গীর প্রিন্টিং, এমব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯৬ সনে তিনি প্রিন্টিং ও এমব্রয়ডারি ব্যবসা শুরু করেন। তারপর তিনি জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় একে একে বিভিন্ন ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, এখন কয়েক হাজার কর্মী তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। যেহেতু সিআইপি সেহেতু ব্যবসার জগতে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। গরিব ও দুঃস্থদের সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ২০১৪ সনে গড়ে তোলেন ‘জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন’।
‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠন করে তিনি সমালোচিত হচ্ছেন। এই ব্যাপারে তার বক্তব্য হচ্ছে, তিনি বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন নেতার সাথে আলাপ করে পদক্ষেপ নিয়েছেন। এমন অনুমোদনবহির্ভূত সংগঠন তো শুধু হেলেনা একা করছেন না, অনেকেই করছেন। ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ করছে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগ’; অবশ্য মাঝে মাঝে এই সংগঠনকে আওয়ামী লীগ নিজেদের সংগঠন হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানায়। অনুমোদনহীন এমন আরও শতাধিক সংগঠন ‘লীগ’, ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে টিকে আছে। আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও নামসর্বস্ব সংগঠনগুলো কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কেবল অপরাধ চিহ্নিত হলেই ভুঁইফোড় এই সকল সংগঠনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে থাকে; অন্য সময়ে দেখেও না দেখার ভান করে। কারণ অনুমোদিত মাত্র আটটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে সকল নিবেদিত কর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ হয় না। ক্ষমতায় থাকলে এমন ভুঁইফোড় সংগঠন সব রাজনৈতিক দলেরই থাকে, ক্ষমতা চলে গেলে এই সকল সংগঠনের নীরবে মৃত্যু ঘটে।
হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর নির্বাচিত পরিচালক। এছাড়াও তিনি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএরও সদস্য। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি হিসেবে স্বীকৃত হেলেনা জাহাঙ্গীর অতি সম্প্রতি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের পর তার বিরুদ্ধে নানা অপরাধের অভিযোগ উঠছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় তার বিরুদ্ধে নানাবিধ অপকর্মের ফিরিস্তি দেওয়া হচ্ছে। বহিষ্কার-পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বা মিডিয়া নিশ্চুপ ছিলো। তার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, তিনি অনুমোদন না নিয়েই ‘জয়যাত্রা আইপি টেলিভিশন’ প্রতিষ্ঠা করে বহু অপকর্ম করেছেন। আমাদের সমাজে প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে হলে শুধু টাকা থাকলে হয় না, মিডিয়ার মালিকানাও থাকতে হয়; হেলেনাও তাই করেছেন, তিনি অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে অনুমোদনহীন আইপি টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে অনুমোদনহীন আইপি টেলিভিশন শুধু হেলেনার ছিলো বলে মনে হয় না, সম্ভবত অনেকেরই আছে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সংগঠনটির জন্ম হয়েছে ১৯৪৯ সনে; মুসলিম লীগ বিলীন হয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ দল। ১৯৭৫ সনে আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুকে খুন করার পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২২ বছর ক্ষমতায় আসতে পারেনি। আমাদের এলাকার চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির এক নেতার মুখনিঃসৃত বক্তব্য ছিলো, ভারতে কংগ্রেস এবং বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কবর হয়েছে, মাটি ভেদ করে উঠলে শুধু পোস্টমর্টেম হবে, প্রাণ আর ফিরে পাবে না। তিনি যখন কথাটি বলেছিলেন তখন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা যেত না। পার্টির পুরোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গও এই নাম উচ্চারণে ম্রিয়মাণ ছিলেন; বঙ্গবন্ধুর নাম সম্ভবত প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারণ করেছিলেন আতাউল গণি ওসমানি এবং কবি নির্মলেন্দু গুণ। ১৯৭৭ সনে প্রতিকূল পরিবেশে বাংলা একাডেমির কবিতা পাঠের আসরে কবি নির্মলেন্দু গুণ তার ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতার ছত্রে ছত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা উচ্চারণ করলেন। এমন একটি দুরবস্থা থেকে আওয়ামী লীগকে তুলে আনলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
বর্তমানে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে দলের অন্য নেতারা অনেকটা উদাসীন ও নির্লিপ্ত। শুধু আওয়ামী লীগের কর্মী নয়, জনগণের মধ্যেও এমন একটি ধারণার জন্ম হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কোন নেতার সক্রিয়তা নেই। আরও একটি ধারণা মানুষ পোষণ করে এবং তা হলো, প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত আর কেউই সততার সাথে আন্তরিক নন। এটা গেলো শেখ হাসিনার সরকার সম্পর্কিত; কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের দেউলিয়াত্ব নিয়েও জনগণ হতাশ। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কর্মীদের বক্তব্য হচ্ছে, শেখ হাসিনা একা আর কত সামলাবেন। শেখ হাসিনা ব্যতীত অন্য নেতাদের প্রতি এই যে বীতশ্রদ্ধা তা দলটির ইমেজ নষ্ট করছে। আওয়ামী লীগ পরপর তিনবার সরকার গঠন করে দেশকে এগিয়ে নিতে সমর্থ হলেও দলটির সাংগঠনিক দক্ষতা এনালগ স্তরে রয়ে গেছে; তাই সরকার হয়ে পড়েছে প্রশাসননির্ভর।
আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনে হেলেনা জাহাঙ্গীরেরা যখন কেন্দ্রীয় নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নিবেদিত কর্মীদের ডিঙ্গাতে থাকেন, কেন্দ্রীয় নেতারা যখন মুখভরা হাসি দিয়ে এদের সাথে ছবি তোলেন তখন তাদের গুরুত্ব বেড়ে আকাশচুম্বী হয়ে উঠে, ওদের মুখ থেকে বের হয়ে আসে, ‘শেখ হাসিনা ছাড়া আর কাউকে আমি গুনি না’। তাদের এমন অহংবোধ একদিনে জন্মায়নি, বহুদিনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এমন হয়েছে। এই অহংবোধে মাতাল থাকে বলেই হেলেনারা নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে হুঁশ হারিয়ে ফেলে, বিপদে পড়লে কোন নেতা যে তাদের রক্ষা করবে না এই বোধটুকুও তাদের আর থাকে না। এমন আত্মম্ভরী লোকদের শেষ পর্যন্ত পালাতে গিয়ে কাদায় গড়াগড়ি দিতে হয়, রক্ষণশীল অনুভূতির বেড়াজালে মদ রাখার জন্য হাজতে যেতে হয়। এদের জন্য দুঃখজনক হচ্ছে, এদের সৃষ্টির দায় কেউ নেয় না।
হেলেনা জাহাঙ্গীরকে দল থেকে সময়মত সতর্ক করা হলে হয়ত বাড়াবাড়ি করার সাহস করতেন না। নিচের নেতাকর্মীদের উপর হঠাৎ খড়গহস্ত হওয়ার প্রয়োজন হয় না যদি শৃঙ্খলা রক্ষার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি সঠিকভাবে অনুসৃত হয়। কর্মীর কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করা হলে কেউই উড়ে এসে জুড়ে বসতে পারে না। কর্ম দিয়ে নেতার কৃপা পাওয়া যায় না বলেই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মীরা নেতাদের তোয়াজ করে অবিরত পোস্ট দিচ্ছ। কমিটির পদ বিক্রির খবরও মাঝে মাঝে মিডিয়ায় প্রকাশ পায়।
কর্মীরা হতাশ, দলের নেতাদের মৃত্যু বা বহিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তারা পদ-পদবী ছাড়তে চান না। শুধু তাই নয়, নেতার এলাকায় যাতে কেউ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য যা করার দরকার তাই করা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কর্মীরা আওয়ামী লীগের প্রাণ, এদের চিনে রাখার দায় ও দায়িত্ব নেতাদের। নিবেদিত কর্মী চেনার কাজটুকুও নেতারা আজকাল করেন বলে মনে হয় না, যদি কর্মীদের চেনেন তাহলে হেলেনা, পাপিয়া বা শাহেদের সৃষ্টি হতে পারে না।
বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে আওয়ামী লীগকে দুরবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য শেখ হাসিনার আবির্ভাব হয়েছিলো, শেখ হাসিনার পর এমন কোন নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে না। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন হয়। আদর্শভিত্তিক কাজ না থাকলে কর্মীরা অকাজ করবে। দুই দিন আগেও হেলেনা সিআইপি, ব্যবসাজগতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন, তাকে বিভিন্ন উপাধি দিয়ে ভূষিত করা হয়েছে। এখন তিনি সমাজ এবং আওয়ামী লীগের জন্য অপাঙ্ক্তেয়, হেলেনার ছবি এখন এরশাদ সাহেব ও খালেদা জিয়ার সাথেও পাওয়া যায়।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com