আজ রবিবার, ২৫ জুলাই, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
জনতার বিক্ষোভে অশান্ত কিউবা
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
করোনার নতুন ঢেউ ছড়িয়ে পড়ায় ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপ কিউবা অশান্ত হয়ে উঠেছে। সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ মিছিল করছে। জিনিসপত্রের দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য হচ্ছে না, কাজ এবং খাবারের জন্য জনগণকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে; তাই কিছু লোক কমিউনিস্ট শাসন থেকে মুক্তি চেয়ে রাস্তায় বিক্ষোভ করছে। মিছিলের লোকগুলো শুধু কাজ, খাবার, ওষুধের অভাবের কথা বলছে না, কমিউনিস্ট শাসন ও শাসকের বিরুদ্ধেও বলছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বাতিস্তা সরকারকে উচ্ছেদ করে ফিদেল ক্যাস্ত্রো ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতা নেয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র কিউবার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে; এই অবরোধের কারণে কিউবার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে কখনো শক্ত ভিত তৈরি হতে পারেনি। এই অবস্থায় করোনাভাইরাসের আক্রমণে লকডাউন ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দায় দ্বীপদেশটিতে অর্থনৈতিক দুর্দশা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বর্তমান বিক্ষোভের পেছনে আমেরিকার ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলে কিউবা অভিযোগ করেছে।
কিউবা প্রজাতন্ত্র অনেকগুলো দ্বীপের সমষ্টি; এই দ্বীপগুলোর মধ্যে প্রধান দ্বীপটি হচ্ছে কিউবা। কিউবা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যস্থলে অবস্থিত। কিউবার এক কোটি বার লাখের মতো মানুষ মূলত খৃষ্টান। কিউবার বেশিরভাগ লোক কৃষিকাজ ও পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। উর্বর ভূমির কারণে প্রচুর কফি, ভুট্টা, আলু, চাল, আখ ও তামাক চাষ হয়। খনিজ সম্পদেও কিউবা সমৃদ্ধ। চারশত বছর ধরে কিউবায় স্পেনের উপনিবেশ ছিলো। যে আমেরিকা কিউবার কমিউনিস্ট শাসন উৎখাতে ষড়যন্ত্র করছে সেই আমেরিকা ১৮৯৮ সনে কিউবার পক্ষ নিয়ে স্পেনিয়র্ডদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তবে যুদ্ধ করে স্পেন থেকে স্বাধীন করলেও তারা আবার কিউবাকে মার্কিন প্রতিরক্ষার অধীনে রেখে দেয়। ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বে সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতিপরায়ণ স্বৈরশাসকদের হাতে কিউবা শাসিত হয়েছে।
মার্কিন মদদপুষ্ট বাতিস্তা সরকারের পতন হলে কৃষি ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ কিউবায় মার্কিন পুঁজিপতিদের একচেটিয়া ব্যবসারও অবসান হয়। সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ বিপরীতধর্মী অর্থব্যবস্থা। ব্যবসায়িক আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই কমিউনিস্টবিরোধী। কমিউনিস্ট-ভীতি থেকে পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়। আমেরিকার কূটচালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত সবগুলো দেশ থেকে সমাজতন্ত্র বিলোপ হয়। আমেরিকার বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের সমাজতন্ত্রের বিলোপ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হলেও ঘরের কাছে লাতিন আমেরিকার কিউবায় সমাজতন্ত্রের বিলুপ্তি করা সম্ভব হয়নি। তবে তারা চেষ্টার কমতি রাখেনি; কমিউনিস্টদের শাসন কায়েম হওয়ার পরপরই কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে পৃথিবীর অন্য কোন দেশও কিউবার সাথে ব্যবসা করতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর আমলে কিছু চটের বস্তা কিউবার কাছে বিক্রি করায় বাংলাদেশের জন্য প্রেরিত গমভর্তি জাহাজ গভীর সমুদ্র থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমেরিকা, নতুন করে খাদ্য যোগাড় করতে সময় লাগার কারণে দেশে ১৯৭৪ সনে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় কিউবার সাথে সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়েছিলো; ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা বাতিল করে কিউবার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অবরোধ পুনরায় চালু করেন। কিউবা আমেরিকার কাছে বিষফোঁড়ার মতো, সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকা থামবে বলে মনে হয় না। ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে উৎখাতের বহু চেষ্টা করা হয়েছে; কথিত আছে যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ৬৩৮ বার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কিউবার এই নেতা ছিলেন সতর্ক ও অবিচল। ১৯৬২ সনে কিউবায় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। রাশিয়া কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলো। কিন্তু আমেরিকা কিউবার একটি দ্বীপের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে নৌঘাঁটি গড়ে তুলেছ; এই নৌঘাঁটিতেই বিশ্বব্যাপী নিন্দিত গুয়ানতানামো কারাগারটি রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ধরে আনা লোকদের আমেরিকা বিনা বিচারে এই কারাগারে রেখে দেয়; তীব্র নির্যাতন এড়াতে এখানকার বন্দীরা আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
লাতিন আমেরিকার আরেকটি দেশ ভেনেজুয়েলা; এই দেশের বামপন্থী সরকারকে গদিচ্যুত করতেও আমেরিকা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐ দেশেরই বিরোধীদলীয় নেতা জুয়ান গুয়াইদোকে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ভেনেজুয়েলার জনগণকে জুয়ান গুয়াইদোর নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। রাশিয়া আর চীনের সহায়তায় নিকোলাস মাদুরো এ যাত্রায় রক্ষা পেয়েছেন বলে মনে হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অবরোধের মধ্যেও কমিউনিস্টদের হাতে কিউবার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। চিকিৎসাসেবায় কিউবা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। কিউবায় জনপ্রতি চিকিৎসকের সংখ্যা বিশ্বের যে কোন দেশের চেয়ে বেশি। করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় কিউবার চিকিৎসকরা করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে আমেরিকা, ইতালি প্রভৃতি দেশে গিয়েছিলেন। কিউবা নিজের দেশে করোনা ভ্যাকসিন তৈরি করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলো। নিজেদের উদ্যোগে ভ্যাকসিন তৈরির সংকল্পে দৃঢ় ও আস্থাবান কিউবা ‘আবদালা’ নামে যে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে তা শতকরা ৯২.২৮ ভাগ কার্যকর বলে কিউবা দাবী করেছে। ‘আবদালা’ লাতিন অ্যামেরিকা অঞ্চলে তৈরি প্রথম করোনা ভ্যাকসিন। এছাড়া কিউবা ‘সোবেরানা টু’ নামে আরেকটি ভ্যাকসিনও আবিষ্কার করেছে। এই দুটি ভ্যাকসিন তাদের নাগরিকদের দেওয়া শুরু হয়েছে, আগস্টের মধ্যে ৭০ পার্সেন্ট লোককে তিন ডোজ করে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তাদের বিশ্বাস। সর্বাত্মক অবরোধের মধ্যেও কিউবার এই অভাবনীয় অগ্রগতি আমেরিকার গাত্রদাহের কারণ। ভেনেজুয়েলার মতো কিউবাও বর্তমান সৃষ্ট সংকট উত্তরণে সমর্থ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com