আজ রবিবার, ১১ জুলাই, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
লকডাউন, না শাটডাউন
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টা বাংলাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ও চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি; এই ভ্যারিয়েন্ট শরীরে প্রবেশ করে নিজের ভেতরে নিজে ক্রমাগত মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে। ভারতে এখন একটু কমলেও ভারতকে এই ভাইরাস নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে, ভারতে হাজার হাজার লোক মৃত্যুবরণ করেছে; সৎকারের জন্য সারিবদ্ধ লাশের মিছিলে বীভৎস দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিলো। এই অবস্থায় মানুষ ও যানবাহনের চলাচলে ভারত বিধিনিষেধ আরোপ করে বর্তমানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ভারত এই ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করে টিকার উপর; টিকা সরবরাহের জন্য যে সকল দেশের সাথে চুক্তি ছিলো সেগুলো বাতিল করে নিজ দেশে উৎপাদিত সব টিকা দেশের লোকদের দেওয়া শুরু করে; তবে তাদের উৎপাদিত টিকা দিয়ে তাদের ১৩০ কোটি লোককে ভ্যাকসিনেটেড করতে কমপক্ষে ৩ বছর লাগবে। তবে টিকা ব্যতীত এই ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার আর কোন দ্বিতীয় পথও নেই। ইউরোপ, আমেরিকা টিকা প্রয়োগ করে এখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।
ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশ এখন হিমশিম খাচ্ছে; ইতোমধ্যে প্রতিদিন সংক্রমণ ও মৃত্যুর নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। পনেরশত কিলোমিটারের সীমান্ত বন্ধ করা সম্ভব ছিলো না বলে প্রতিদিন বৈধ ও অবৈধ পথে লোকজনের যাতায়াত ছিলো। নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র ভারত থেকে না এলে বাংলাদেশে করোনার চেয়েও বিপর্যয়কর অবস্থার সৃষ্টি হয়। ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ পেঁয়াজের জন্য বাংলাদেশের লোকেরা অস্থির হয়ে উঠে বলে ভয়াবহ করোনার মধ্যেও পেঁয়াজের আমদানি থেমে ছিলো না। ফলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শহর-বন্দর এলাকায় ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের মতো বাংলাদেশেরও বড় সমস্যা হচ্ছে লোকসংখ্যা; বেহিসাবি লোকসংখ্যার অধিকাংশ খেটে খাওয়া মানুষ, দিনে এনে দিনে খায়, রাতের জন্য সঞ্চয় থাকে না। বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, উভয় দেশের লোক করোনাভাইরাসকে ভয় করে না, ভয় করে লকডাউনকে। খেটে খাওয়া মানুষগুলো খাটতে না পারলে খাবার পায় না, তাদের কোন ব্যাংক একাউন্ট নেই, উদ্বৃত্ত খাবার নেই। এরা জীবিত থেকেও মৃত, তাই মৃত্যু-বারতা তাদের মধ্যে কোন বিকার ঘটায় না। করোনার মৃত্যু তাদের মধ্যে কোন আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারেনি এবং পারেনি বলেই খেটে খাওয়া মানুষগুলো কাজের সন্ধানে দেশের অভ্যন্তরে ছোটাছুটি করছে। এই ছোটাছুটি সান্ধ্য আইন দিয়েও রোধ করা যাবে বলে মনে হয় না; ফলে সীমান্ত জেলাগুলো থেকে করোনাভাইরাসের এই ভ্যারিয়েন্ট রাজধানী ঢাকায় পৌঁছে যাচ্ছে।
করোনাভাইরাস বারবার তার রূপ বদল করে নতুন চেহারায় ভয়ঙ্কর শক্তি নিয়ে হাজির হচ্ছে। রূপ বদলের এই ধারাবাহিকতায় ভারতে যে রূপ নিয়েছে তার নাম ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট; এই ভ্যারিয়েন্টের ভয়ঙ্কর রূপ মানবজাতিকে পুনরায় আতঙ্কিত করে তুলেছে। ইতোমধ্যে শতাধিক দেশে ডেল্টা করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। কাঠামোগত ও চারিত্রিক রূপান্তরের মাধ্যমে এই ভাইরাস দিন দিন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত সবগুলো টিকা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ফলপ্রসূ; রাশিয়ার স্পুটনিক ভি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত না হলেও এই টিকাও ডেল্টা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর বলে রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছে। টিকা নেয়ার পর যারা সংক্রমিত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে উপসর্গ ও অসুস্থতার মাত্রা অনেকটাই কম। অন্যদিকে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ভিন্ন মতও আছে, টিকা নেয়ার পর শরীরে যে অ্যান্টিবডির জন্ম হয় সেটিকে পাশ কাটাতে পারে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, অনেক গরিব দেশের লোক এখনো কোন টিকাই পায়নি, পেলেও এত কম পেয়েছে যে তাদের জন্য হয়তো বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। ডেল্টা ভাইরাস কোন উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়লে তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ঐ সকল দেশের থাকবে না। করোনার উপযোগী করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করার প্রয়োজন নতুন করে দেখা দিয়েছে; করোনায় আক্রান্ত রোগীর কোন সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, প্রকৃতপক্ষে করোনাভাইরাস শরীরের যে সকল অঙ্গের ক্ষতি করে হাসপাতালে তার চিকিৎসা করা হয়; অধিকাংশ রোগীর ফুসফুসে আক্রমণ করে দ্রুত তা ধ্বংস করে দেয় বিধায় আইসিইউ, সিসিইউ, অক্সিজেন সিলিন্ডার ইত্যাদির আবশ্যকতা জরুরি।
ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নেপালের অবস্থা খুবই খারাপ, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের আক্রমণে তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে এই ভ্যারিয়েন্ট হানা দিয়েছে। ইংল্যাণ্ডে ব্যাপক টিকা দেওয়ার পরও এই ভ্যারিয়েন্ট ওখানে ছড়িয়ে পড়েছে, আমেরিকাও এই ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে চিন্তিত। অস্ট্রেলিয়া তাদের সীমান্ত প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলো; কিন্তু ভারতের বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার লোকজন ভারতে বেড়াতে এসে প্রত্যাবর্তনের সময় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকেছে। অস্ট্রেলিয়া সরকার যখনি তাদের ঢুকতে দিতে অস্বীকার করলো তখনই অস্ট্রেলিয়ায় রেখে যাওয়া কারো কারো স্ত্রী ও শিশু সন্তানের কান্নারত ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়, সাথে সাথে অস্ট্রেলিয়ান সরকারের মানবতা জেগে উঠে, তাদের ঢুকতে অনুমতি দেওয়া হয়। চীন থেকে যেভাবে করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো ঠিক তেমনি কোন না কোন দুর্বলতায় ভারত থেকে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শুধু প্রবীণ নয় তরুণদেরও সমানতালে আক্রমণ করছে। অস্ট্রেলিয়ার হাসপাতালে ভর্তি থাকা ২০ শতাংশ কোভিডে আক্রান্ত রোগীর বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ডেল্টা ভাইরাসের এমন আচরণের কারণে উন্নত দেশগুলোতে শিশু এবং তরুণদেরও টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।
বাংলাদেশে এখন লকডাউন বাস্তবায়নে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে। লকডাউনের শিথিলতা নিয়ে অনেকে উপহাস করছেন; তাদের অভিমত হচ্ছে, প্রয়োজনে সান্ধ্য আইন দিয়ে দেশকে শাটডাউন করে দিতে হবে। এমন প্রত্যাশার পাশাপাশি তাদের দাবী হচ্ছে, কানাডা, আমেরিকার মতো শাটডাউন চলাকালীন অভাবী লোকদের বাসায় বাসায় খাবার পৌঁছে দিতে হবে। সরকারের সামর্থ্য আছে, কি নেই তা বিবেচ্য বিষয় নয়। মনে রাখতে হবে যে, উন্নয়ন হলেও দেশের এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়নি, কানাডা বা আমেরিকার মতো দীর্ঘদিন কর্মহীন লোকদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো সম্ভব। এছাড়া দেশের সকল কর্মকাণ্ড অর্ধমাস সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হলে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যায় সবজী ক্ষেত নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে, বিক্রি করতে না পারলে বহু পরিবার পথের ভিখারি হয়ে যাবে। আমসহ মৌসুমী ফল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা দেশে নেই, শাটডাউন হলে ফল উৎপাদক ও বিক্রেতার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। পোশাকশিল্প বন্ধ রাখা হলে বিদেশি আমদানিকারক ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা বা চীনে দৌড়াবে। ঢাকা শহরে ২ কোটি লোকের জন্য শুধু কাঁচাবাজার খোলা রাখা হলেও রাস্তায় লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে। একজন থেকে আরেক জনের দূরত্ব বজায় রেখে রাস্তায় চলাচল করতে হলে ঢাকা থেকে দেড় কোটি লোক সরিয়ে নিতে হবে। অধিকাংশ লোক মাস্ক পরে না, মাস্ক না পরার যে সকল কারণ পথচারীরা উল্লেখ করেন তা শুনলে হাসি পায়। শক্ত, সামর্থ্য কিছু লোক পুলিশ বা মিডিয়ার লোক দেখলে দ্রুত মাস্ক পরে পরক্ষণেই খুলে ফেলে। অবশ্য যারা দৈহিক পরিশ্রম করেন তাদের পক্ষে অনবচ্ছিন্নভাবে মাস্ক পরে থাকা সম্ভবও নয়—মাস্ক পরে বেশীক্ষণ রিক্সা বা ভ্যান চালানো কঠিন; এদের জরিমানা করা মানবিকতার লঙ্ঘন।
ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট রোগীর শারীরিক অবস্থা খুব দ্রুত খারাপ করে দিতে সক্ষম। ফুসফুস আক্রান্ত হলে আইসিইউতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করেও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঠেকানো সম্ভব হয় না। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট পরিবর্তন হয়ে আরও শক্তিশালী কোন ভ্যারিয়েন্টের উৎপত্তি হলে বিশ্ব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে যে, আমাদের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। আমেরিকা, ইউরোপ বা ভারতের মতো উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থাও করোনা রোগীর মৃত্যু ঠেকাতে পারেনি, আমেরিকা, মেক্সিকো, ব্রাজিল এবং ভারতে সর্বাধিক লোক মৃত্যুবরণ করেছে এই ভাইরাসের সংক্রমণে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের এই উচ্চ সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য মাস্ক পরা জরুরি। আমরা সব কিছুর জন্য শুধু সরকারকে দায়ী করি, নিজেরা অনেকে দায়িত্ব পালন করি না। মাস্কবিহীন লোকদের কি আমরা কখনো মাস্ক পরার জন্য বাধ্য করেছি? লকডাউন কোন স্থায়ী সমাধান নয়; সবকিছু বন্ধ থাকলে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে, যার পুনরুজ্জীবন আমাদের মতো জনবহুল গরিব দেশের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। শাটডাউন হলে ফুটপাতের দোকানদার, টুকরি-হাতুড়ি, বাটালি নিয়ে বসে থাকা রাস্তার ধারের খেটে খাওয়া মানুষগুলোসহ রিক্সা-ভ্যান চালকদের জীবন ও জীবিকা উভয়ের মৃত্যু হবে, এককালের কুড়িগ্রামের মঙ্গা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে, লঙ্গরখানা খুলেও কঙ্কালসার মানুষের স্রোত বন্ধ করা যাবে না। তাই লকডাউন বা শাটডাউন নয়, সচেতনতাই জরুরি; সচেতনতা সৃষ্টি না হলে জরিমানা বা ভীতিজনক পরিবেশ তৈরি করে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com