আজ রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১; দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় আমার লেখা কলাম। দৈনিক সংবাদে আরেকটি কলাম একই দিন প্রকাশ হওয়ার কারণে এই লেখাটি একটু বিলম্বে পোস্ট করলাম।

উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চীন গণহত্যা চালাচ্ছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ মুহূর্তে উল্লেখ করেছেন। চীনের এমন আচরণকে তিনি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেন। উইঘুর মুসলিমদের বলপূর্বক দাসে পরিণত করার অভিযোগ তুলেছে মার্কিন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি। উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরুদ্ধ আচরণ করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন অপরাধের সঙ্গে জড়িত চীনের সরকারি কর্মকর্তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ উইঘুর ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় উৎপাদিত পণ্য আমেরিকার বাজারে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। উইঘুরের উপর নির্যাতন বন্ধ করতে চীনের উপর চাপ বাড়াতে একটি আইন প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেটের বিবেচনাধীন। পম্পেওর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের একমত পোষণ করায় ধারণা করা যায়, চীনের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ অব্যাহত থাকবে।

উইঘুরদের প্রতি চীন সরকারের দমনপীড়নের আরও নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে। ১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ কেন্দ্রগুলোয় এবং ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক পুনর্বিবেচনার শিবিরে’ অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে জাতিসংঘ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও যেসব অভিযোগ চীন সরকারের বিরুদ্ধে উঠছে তা হলো, ওখানে বন্দীশিবিরে আটক উইঘুর মুসলিমদের ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে, কমিউনিজম মতাদর্শে বিশ্বাস স্থাপনে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে, জোর করে মুসলিম নারীদের গর্ভপাত করানো হচ্ছে, বন্ধ্যা করে দিচ্ছে মুসলিম নারীদের, জোরপূর্বক মুসলিম নারীদের চীনাদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বুলডোজার দিয়ে মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ইত্যাদি। উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে মালয়েশিয়ার একদল পর্যটককে আটক করার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়াও উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উইঘুর সম্প্রদায়ের লোকেরা পূর্ব তুর্কিস্তানের অধিবাসী; এই দেশের চারপাশে অবস্থিত চীন, ভারত, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়ায়ও উইঘুর সম্প্রদায়ের বাস রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ৬০ সন থেকে এই এলাকা হান রাজবংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯১১ সনে মাঞ্চু সাম্রাজ্য উৎখাতের পর পূর্ব তুর্কিস্তানে চীনা শাসন চালু হলেও ১৯৩৩ ও ১৯৪৪ সনে চীনাদের সঙ্গে লড়াই করে উইঘুর সম্প্রদায় পুনরায় স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু ১৯৪৯ সনে আবারও তারা মাও সেতুংয়ের চীনা কমিউনিস্টদের হাতে পরাজিত হয়। চীনের অধীনে আসার পূর্বে তুর্কিস্তানে ইসলাম ও আরবের প্রভাব বাড়তে থাকে এবং স্থানীয় উইঘুর জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। জিনজিয়াংয়ে মুসলমানেরা চীনা জনসংখ্যার ১ দশমিক ৫ শতাংশ। উইঘুর সম্প্রদায় কখনো চীনের অধীনে থাকতে চায়নি, গত শতাব্দীর শেষে উইঘুর মুসলমানেরা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে; এজন্য তাদের দমনের জন্য প্রায়ই সেনাবাহিনীর তল্লাশি চলে, বিভিন্ন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে তাদের বন্দী করে রাখা হয়।

চীন কখনোই আমেরিকা বা জাতিসংঘের অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়নি; এই সকল অভিযোগ তারা শুধু অস্বীকার করে না, বরং উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে চীন বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার পাল্টা অভিযোগ উপস্থাপন করে থাকে। তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে চীন চরম সংরক্ষণবাদী। বিদেশি সাংবাদিকদের অবাধ যাতায়াতে বাধানিষেধ থাকায় কালেভদ্রে কিছু তথ্য গোপনে বের হয়ে আসে। এছাড়াও দেশের অভ্যন্তরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকায় উইঘুরদের উপর নির্যাতন বা তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রকৃত তথ্য উন্মোচিত হয় না। চীনে কমিউনিস্ট শাসন কায়েম হওয়ার পর থেকেই ধর্মের গুরুত্ব কমে যায়; বিশ্বের জন্য চীন কিছুটা উন্মুক্ত হওয়ার পর কমিউনিস্ট আদর্শ বাস্তবায়নে কিছুটা শিথিলতা এলেও চীন এখনো ধর্মের ব্যাপারে নির্লিপ্ত; মার্ক্সবাদ অনুযায়ী ধর্ম আফিমের মতো মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে, ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা ধর্মান্ধ ও আফিমখোর কারোই থাকে না।

চীনের এক সময়ের নীতি ছিলো, প্রতিটি নারীর একটির বেশী সন্তান হবে না, পরে তা দুইটি করা হয়। একটি বা দুইটি করে সন্তান নেয়ার পলিসি থাকা সত্ত্বেও চীনের জনসংখ্যা এখন ১৪৪ কোটি। কিন্তু উইঘুরের মুসলমানেরা এই নীতি মানছে না বলে জন্মদানের কোটা যাতে অতিক্রম না হয় সেজন্য কড়া তদারকি করা হয়। যেসব নারীর সন্তানের সংখ্যা এর চেয়ে বেশী তাদের জন্মনিয়ন্ত্রক ওষুধ গ্রহণ বা স্টেরিলাইজেশন সার্জারি করাতে বাধ্য করা হচ্ছে, নারীদের প্রতি দুই মাস অন্তর স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে গর্ভাবস্থা পরীক্ষা করাতে হয়। শুধু উইঘুরের মুসলমান নয়, ১৯৭০ সনে এক সন্তান নীতি গ্রহণের পর সকল চীনাদের ক্ষেত্রেও জোর করে গর্ভপাতের মাধ্যমে এই নীতি কার্যকর করা হয়েছে। ধর্মের কারণে উইঘুরের মুসলমানগণ এই নীতি কখনোই মানতে চায়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের অধিকাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ করে না বিধায় উইঘুর সম্প্রদায়ের মতো মুসলমানদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশী বাড়ছে।

মুখ দেখেই যাতে উইঘুরদের চেনা যায় তেমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করে চীন সরকারকে দিচ্ছে চীনের তথ্যপ্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে—এই খবরটি পাওয়ার সাথে সাথে উইঘুর মুসলমানদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী তারকা ফুটবলার এবং হুয়াওয়ে কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর আঁতোয়া গ্রিজম্যান হুয়াওয়ের সঙ্গে করা স্পনসরশিপ চুক্তি বাতিল করেছেন। আঁতোয়া গ্রিজম্যান নিজের বিরাট স্বার্থ ত্যাগ করে উইঘুরদের পক্ষে অবস্থান নিলেও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীর মুসলমানেরা কিন্তু চীনের উইঘুরদের নিয়ে খুব বেশী মাথা ঘামায় না। আমরা বাংলাদেশের মুসলমানেরা যেভাবে ফ্রান্স ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সোচ্চার হয়েছিলাম তেমন সোচ্চার কখনো চীনের বিরুদ্ধে হইনি; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চীনের উইঘুর সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। পৃথিবীর মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসিও এ ব্যাপারে কখনো সরব হয়েছে বলে দেখা যায়নি। মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী দেশগুলোর সাথে চীনের সম্পর্ক ভালো; তাই সম্ভবত মুসলমানেরা চীনের ব্যাপারে কিছুটা নমনীয়। পৃথিবীর কোন দেশ বিভিন্ন সংস্কৃতির আলাদা জাতিসত্তা মানতে চায় না। চীনও চায় উইঘুর আদর্শ বদলে ফেলুক, কমিউনিস্ট চীনের অনুগত হোক। তাই চীন উইঘুরদের বন্দীশিবিরগুলোকে বলছে ‘পুনঃশিক্ষা শিবির’। বিভিন্ন দেশে যারা অভিবাসী হতে চায় তাদের অভিবাসী হওয়ার শর্তই হচ্ছে দেশের বৃহত্তর জাতিসত্তার সাথে মিশে বিলীন হওয়া। মিশে যেতে পারে না বলেই দেশে দেশে সংঘাত লেগেই আছে।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com