জিয়াউদ্দীন আহমেদ

আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ করে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানদের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করেছে। আফগানিস্তানে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে যুদ্ধ চললেও তালেবানরা নিশ্চিহ্ন হয়নি, বরং অনেকের ধারণা তারা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে।

তালেবান শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছে আফগান নারী। ১৯৯৬ সালে মাদ্রাসার ছাত্ররা তালেবান নামে ক্ষমতায় আসার পরই শুরু হয় নারীদের ওপর নানান বিধিনিষেধ। এমনকি নেইলপলিশ পরার জন্যও প্রকাশ্যে সন্তানের সম্মুখে বেত্রাঘাত করা হয়েছে মায়েদের। মেয়েদের স্কুল যাওয়া বন্ধ এবং চাকরি করার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ভরণপোষণের দায়িত্ব পুরুষের ওপর ন্যস্ত থাকায় নারীদের ঘরে আবদ্ধ থাকাকে সর্বোত্তম ধর্মীয় পন্থা বলে মনে করা হয়। তাদের মতে মেয়েরা বাইরে গিয়ে লেখাপড়া, ব্যবসা বা চাকরি করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করলে পুরুষ তাদের চোখ, কান ও শারীরিক জিনা থেকে মুক্তি পাবে না। তালেবান আমলে মেয়ে রোগীর পুরুষ চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়াও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল; কিন্তু নারীদের স্কুল-কলেজে যেতে না দিলে নারী চিকিৎসক আসবে কোথা থেকে? জরুরি কাজে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে নারীদের সমস্ত শরীর বোরকায় ঢেকে বের হতে হতো; মাহরম বা পরিবারের ঘনিষ্ঠ একজন পুরুষ অবশ্যই মেয়েদের সঙ্গে থাকতে হতো, মাহরম ছাড়া কোনো নারী একা বের হলে জনসম্মুখে বেত্রাঘাত করা হতো। অনেক নারী প্রথম প্রথম না জেনে বোরকা ও মাহরম ছাড়া রাস্তায় বের হলে তালেবান যোদ্ধারা তাদের লাঠি দিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়েছে। তালেবান আমলে সব বিনোদনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল, নাচ-গান-নাটক-সিনেমা কোনো কিছুর অনুমোদন ছিল না।

ইরান, তাজিকিস্তান, চীন, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যস্থলে ভূ-বেষ্টিত একটি মালভূমির ওপর আফগানিস্তান অবস্থিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’ এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ পড়ে আমরা আফগানদের চালচলন, আচার-ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারি। অসংখ্য গোত্রে বিভক্ত আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের সময় ১৯৭৮ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে নিষিদ্ধ বামপন্থী দল ক্ষমতায় এলে ইসলামী মুজাহেদিনরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশের সহযোগিতায় এই শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করে। সোভিয়েত রাশিয়া ক্ষমতাসীন বামপন্থী দলের প্রধানমন্ত্রী ড. নজিবুল্লাহকে সমর্থন দেওয়ার অভিপ্রায়ে ১৯৭৯ সনে আফগানিস্তানে সৈন্য প্রেরণ করে। দশ বছর পর ১৯৮৯ সনে সোভিয়েতরা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে ১৯৯২ সালে নজিবুল্লাহ সরকারের পতন ও দেশটিতে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এরপর ১৯৯৬ সালে তালেবানরা রাজধানী কাবুল দখল করে এবং ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে গঠিত সংগঠন আল কায়দাকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেয়। টুইন টাওয়ারে হামলার পর ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ভূমি ব্যবহারের মাধ্যমে আফগানিস্তান আক্রমণ করে তালেবানদের ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়; কিন্তু পাথর দিয়ে গড়ে ওঠা পাহাড়, পানিবিহীন মরুভূমি আর দুর্গম গুহা অঞ্চলে টিকে থাকা চরম কষ্টসহিষ্ণু আফগান জাতিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বরং মার্কিন বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনায় মানুষ বিরক্ত।

নানা গোত্র ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের প্রবল কর্তৃত্ব আফগানিস্তানে। শরিয়া আইনের সামান্যতম শিথিলতাও সেখানে মেনে নেওয়া হয় না। আফগান নারীদের আশঙ্কা, তালেবানরা আবার ক্ষমতায় এলে নানা নিপীড়ন নেমে আসবে নারীদের উপর। কথায় কথায় দোররার শিকার হতে হবে, সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হবে শিক্ষিত আফগান মেয়েরা।

তালেবানেরা ক্ষমতায় না থাকলেও তাদের চোরাগুপ্তা হামলার ভয়ে এখনও সবাই ভীত। শরিয়াবিরোধী আচরণের জন্য এখনো তালেবানদের কাছ থেকে হুমকি আসে। এই জন্য তালেবানদের পতনের পরও আফগান নারীদের জীবন নিরাপত্তাহীন। A Thousand Splendid Suns বইটিতে উল্লেখ আছে, স্ত্রীদের পেটানোর জন্য প্রায় সবার ঘরে একটি করে লাঠি সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়। স্ত্রীদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়ে আইনজীবী জয়নব ফয়েজ আদালতে বহু স্বামীর শাস্তির ব্যবস্থা করার কারণে তালেবানরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়; তিনি কান্দাহার থেকে পালিয়ে কাবুলে বসবাস করছেন। তালেবানদের মতে, আইনজীবী জয়নব ফয়েজ স্বামীদের শাস্তির ব্যবস্থা করে কোরআনের নির্দেশনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন।

আফগানিস্তানে এক সময় হিন্দু, বৌদ্ধসহ আরো নানা ধর্মের মানুষের বসবাস ছিল। মুসলমান ব্যতীত আর সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব মুছে দিয়েছে তালেবানরা। অনেকে দেশ ছেড়েছেন, অনেকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন। আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ থেকে ফেরত যাওয়ার পথে তার কিছু সঙ্গী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে থেকে যান। কালাশ নামের এই উপজাতিকে নির্মমভাবে শেষ করার চেষ্টা করছে তালেবানেরা, তাদের প্রাচীন মন্দির ও দেবতার কাঠের মূর্তি ইতোমধ্যে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আফগানিস্তানের নুরিস্তানে থাকা অসংখ্য কালাশ নরনারী তালেবানি অত্যাচারে ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। সারা পৃথিবীর আকুতি-মিনতিকে অবজ্ঞা করে দেড় হাজার বছর পূর্বের বামিয়ানের বৌদ্ধমূর্তি তালেবানরা ভেঙেছেন; বামিয়ান উপত্যকার পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা ছিল ওই ভাস্কর্য দুটি। কলকাতার মেয়ে সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রেমে পড়ে আফগান যুবক জানবাজ খানকে বিয়ে করে আফগানিস্তানে একটি ওষুধের দোকান দিয়ে সংসারে চালাচ্ছিলেন; তালেবানরা তাকে ‘ভ্রষ্ট নারী’ আখ্যা দিয়ে তার ওষুধের দোকানটি বন্ধ করে দেয়। তিনি ভারতে পালিয়ে এসে জীবন বাঁচান। ২০০১ সালে তালেবানদের পতন হলে তিনি আবার আফগানিস্তানে স্বামীর গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন, কিন্তু সম্প্রতি তাকে তার স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের সম্মুখে তালেবানরা কতল করে।

আফগানিস্তান সবসময় নারীদের জন্য বৈরী। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আফগান নারী এমনিতেই পিতা বা স্বামীর মতামতের বাইরে কথা বলার অধিকার রাখে না। মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠুক—এটা আফগান পুরুষেরাও চায় না। স্কুল বা কাজে বাইরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় আফগানিস্তানে অনেক কন্যাসন্তানকে মা-বাবার হাতে, অনেক বোনকে ভাইয়ের হাতে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে। এই সকল হত্যার অভিযোগ হয় না, পুলিশ নিজ থেকে খোঁজ নেয়ার গরজ বোধও করে না। সমাজ মনে করে, মেয়েটি খারাপ বলেই হত্যা করা হয়েছে। আফগানিস্তানে সেই নারীই আদর্শ নারী যার কণ্ঠ বাইরের কেউ শোনেনি এবং যার চেহারা চন্দ্র-সূর্য কখনো দেখেনি। যে পুরুষ নারীদের কঠোর শাসনে রাখে সেই পুরুষ সমাজে তত বেশি সম্মানিত। পুরুষরা নিজেদের সম্মান রক্ষার জন্য নারীদের সারা শরীর ও নাম ঢেকে রাখতে বাধ্য করে। ওষুধের প্রেসক্রিপশনে নাম লেখা রয়েছে দেখে এক স্বামী ক্রোধান্বিত হয়ে বউকে পিটিয়েছেন, কারণ তিনি চিকিৎসককে নিজের নাম বলেছেন। আফগান আইন অনুসারে শিশুর জন্মসনদে মায়ের নাম থাকত না। রক্ষণশীল পুরুষদের অভিমত হচ্ছে, যে নারী তার সন্তানের পিতা কে তা জানে না সে নারীই শুধু সন্তানের পরিচয়পত্রে নিজের নাম রাখতে চান। আফগানিস্তানে বহুদিন ধরে সন্তানদের পরিচয়ে মায়ের নাম লেখার দাবি করছেন নারীরা।

বুলেট এবং ধর্মীয় নিপীড়ন বিধ্বস্ত আফগানিস্তান। রাশিয়াকে শায়েস্তা করার অভিপ্রায়ে আমেরিকার সহায়তায় পাকিস্তানি ভূখণ্ডে তালেবানরা অস্ত্রচালনায় পারদর্শী হয়। টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের সন্ত্রাসী ঘোষণা করে তাদের নেতাদের মাথার মূল্য নির্ধারণ করে। এই সুযোগে রাশিয়া তালেবানদের শক্তির জোগান দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তালেবানদের সঙ্গে টেবিলে বসে সমঝোতার চুক্তি করছে, তাদের দেওয়া শর্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবানেরা ক্ষমতায় এলে আবার হয়তো মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হবে, রাজনীতিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হবে, অল্প বয়স মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া শুরু হবে, ব্যভিচারের অভিযোগে কাবুলের প্রধান স্টেডিয়ামে নারীদের পাথর ছুড়ে হত্যা শুরু হবে, আফগানিস্তানে মেয়েদের স্বাধীনতা উবে যাবে, আর ভিয়েতনামের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ‘সফল পরাজয়’ হবে।

—সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

https://shampratikdeshkal.com/opinion/news/210751368/%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%AB%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80