প্রধানমন্ত্রী সংসদে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘চোর ধরে চোর হয়ে যাচ্ছি’। কথাটি মিথ্যে নয়। বিরোধী দল এবং বিভিন্ন মিডিয়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অপরাধ ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করছে, রীতিমতো উপহাস করছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কতগুলো ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অনমনীয় মনোভাব অপরাধে ডুবে থাকা দলীয় নেতা, কর্মীদের বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে এবং তাদের গ্রেফতারে আওয়ামী লীগের ইমেজও নষ্ট হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যতীত অতীতে আর কোন দলীয় সরকার নিজ দলের নেতা-কর্মীদের অপকীর্তি এভাবে কখনো জনসম্মুখে আনার চেষ্টা করেনি, শেখ হাসিনা যা এখন করছেন। তবে কোন দলীয় সরকারের পরাজয় বা পতনের পর তাদের সব অপকীর্তির আমলনামা পরবর্তী সরকারের আমলে প্রকাশিত হতে দেখা গেছে, এর সাথে আবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসাও যোগ হয়েছে, ক্ষমতা হারানো নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা রুজু হতে দেখা গেছে। অপরাধের উন্মোচন ও অপরাধীদের গ্রেফতারে শেখ হাসিনার এমন উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের আমলের সব অপরাধ, দুর্নীতি উদ্ঘাটিত হবে না। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাসহ জানা-অজানা নানা অপরাধ উদ্ঘাটিত হবে বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে। তখন আবার নিজ দলীয় নেতা-কর্মী বা সরকারের কোন অপরাধ আর গ্রাহ্য করা হবে না। আরামবাগ-ফকিরেরপুলের স্পোর্টিং ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো চলছিলো বহুদিন ধরে; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর স্বাভাবিক কর্মতৎপরতায় এই অপরাধ অঙ্কুরেই বিনাশ হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু হয়নি। সরকারপ্রধান যখন এই বিশেষ অপরাধ নির্মূলে আপসহীন হয়ে উঠেন তখন অপরাধী বোরকা পরেও পালানোর পথ পায়নি, তাদের অপ্রতিহত অপরাধে সাহস যোগানোর জন্য তখন আর কাউকে খুঁজেও পাওয়া যায়নি।
সাধারণ জনগণের ধারণা, অপরাধ বা দুর্নীতি করে অর্জিত অর্থের ভাগবাটোয়ারা হয় বিভিন্ন স্তরে; স্থানীয় থানাকে বশ করার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করা ছাড়াও দলীয় নেতাদের অর্থ জোগান দেওয়া অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। এই সব চ্যানেল বশীভূত হলে অপরাধীরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলে এমন এক বা একাধিক নেতা থাকেন যাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি জাহির করতে কোন পদের প্রয়োজনও হয় না; সবাই বিনা বাক্যে তাদের সমীহ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতিবাজ কর্মীরাও এতে খুশি হয়, তারা বুঝতে পারে, অপরাধ ও অপরাধীকে রোধ না করার জন্য তাদের শাস্তি হবে না, তারাও নিশ্চিন্তে দুই পয়সা নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশে কামাতে পারবে। এই অঘোষিত সিস্টেম ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দেওয়ার পরও অপরাধী ও দুর্নীতিবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। মনিটরিং ও জবাবদিহিতা না থাকলে কোন পরীক্ষিত সিস্টেমও কাজ করে না। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের এমন পদক্ষেপে বিরোধী দল ও মিডিয়ার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া না থাকলে, অকারণে আইন-কানুন কঠোর হলে, অফিস-আদালতে জনগণের অধিগম্যতা সহজ না হলে দুর্নীতি রোধ করা প্রায় অসম্ভব। একজন ভুক্তভোগী যখন প্রতিকার চাওয়ার রাস্তা খুঁজে পায় না, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে তখন অধস্তনরা অপরাধ ও দুর্নীতি করার অবাধ সুযোগ পেয়ে যায়। অন্যদিকে সরকারের লোক ও ক্ষমতাসীন দলের অপরাধীদের দুর্নীতি উদ্ঘাটনের পর বিরোধী দলের নেতিবাচক সমালোচনায় সরকার মাঝপথে থেমে যেতে বাধ্য হয়।
কোন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দুর্নীতিবাজ হলে অধস্তনেরা দুর্বিনীত হয়ে উঠে। আশির দশকের শেষ দিকে রূপনগরে আমি পৌনে দুই কাঠার একটি প্লট পেয়েছিলাম, রেজিস্ট্রি করার দিন গৃহসংস্থান অধিদপ্তরের এক করণিক চিৎকার করে আমাদের কাছে ঘুষ চেয়েছিলো, তাকে অফিস থেকে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছিলো। আমরা কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে নালিশ করতে গিয়ে বেকুব হয়ে যাই। তিনি স্পষ্ট করে বললেন, ‘এত কম টাকায় একটি প্লট লটারিতে পেয়ে গেছেন, একটু খরচ করুন’। আবার কোন বড় কর্মকর্তা অথর্ব হলে, কাজে অনাগ্রহী হলে দুর্নীতিবাজ করণিক বা অধস্তন কর্মকর্তারা ঘুষ গ্রহণে বেপরোয়া হয়ে যায়; তারা গৃহীত চিঠি, আবেদন-নিবেদন ফেলেও দিতে পারেন অথবা অনির্দিষ্টকাল উপস্থাপন না করে ড্রয়ারে রেখে দিতেও পারেন। পানির বিল পরিশোধ করার পরও পুনরায় একই বিল পরিশোধের নোটিশ ইস্যু হয় ফকিরেরপুলের অফিস হতে; আমি একটি আবেদনে প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করে পরিশোধিত বিলের কপিসহ ফকিরেরপুল অফিসে যাই। ফকিরেরপুলের অফিস বলে যে, এই বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে কাওরান বাজার অফিস। গেলাম কাওরান বাজার অফিসে; সেই অফিসের হিসাব-কর্মকর্তা আমার আবেদন দেখেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘আবেদনে সম্বোধন করেছেন ফকিরেরপুলের অফিসকে, আমি নিতে পারব না’। বললাম, ‘কেটে এড্রেস পরিবর্তন করে দিই’। তিনি আরও ক্ষেপে গিয়ে বললেন, ‘কাটাছেঁড়া দরখাস্ত নেয়া যাবে না’। তখন একটা কাগজ দিতে বললাম, তিনি বললেন, ‘আরেক দিন আসুন’। পরের দিন যাওয়ার পর বললেন, ‘আরেকদিন আসুন, আজ শাখার করণিক আসেনি, যাচাই করা সম্ভব নয়’। এরা অফিসের কাউকে কেয়ার করেন না, গ্রাহক কিছু বললে অফিসের সবাই একজোট হয়ে যান।
সাম্প্রতিককালের শাহেদ করিমের মতো সোনালী ব্যাংকের প্রয়াত সিবিএ নেতা বিএম বাকের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের বিদেশযাত্রায় বিদায় জানাতে এবং বিদেশ থেকে আসার পর রিসিভ করতে বিমানবন্দরে যেতেন এবং ছবি তুলে তা ব্যাংকের বড় বড় কর্মকর্তাদের দেখাতেন। এই সিবিএ নেতা ভিকারুননিসা স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে কোটি টাকা খরচও করেছিলেন। এমন সিবিএ প্রতিটি অফিসে এখনো দোর্দণ্ড প্রতাপে বহাল আছে। কোন কোন অফিসে এদের হাত করে অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারাও সমানতালে দুর্নীতি করতে থাকে। শুধু সিবিএ কেন, কোন কোন পেশার সংগঠন সিবিএ-এর চেয়েও শক্তিশালী। এরশাদ সাহেবের আমলে প্রণীত ওষুধনীতি চিকিৎসক এবং ওষুধ প্রস্তুতকারকদের স্বার্থবিরোধী ছিলো বলে তাদের প্রেসার এবং বিএনপি সরকারের অনীহায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি; ঐ ওষুধনীতির বাস্তবায়ন সম্ভব হলে স্বাস্থ্যখাতের এমন বেহাল দশা সম্ভবত আমাদের দেখতে হতো না।
দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে কখনো প্রশাসন, কখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কখনো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, কখনো শিক্ষা বিভাগ দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান করে থাকে। বনবিভাগ আর সড়ক ও পরিবহণ বিভাগের দুর্নীতি সর্বজনবিদিত। টেন্ডারবাজি, মাদকসেবন, মাস্তানি, প্রাইভেট পরিবহণের একচেটিয়া ব্যবসার স্বার্থে চলন্ত ট্রেনে ঢিল মারা এবং লাভজনক রুটে বিআরটিসির বাস চলাচল বন্ধ রাখা, রুট পারমিট ছাড়া রাস্তায় গাড়ি নামানো, যথাযথ প্রশিক্ষণ ব্যতীত ড্রাইভিং লাইসেন্স হস্তগত করা, ক্ষমতা প্রয়োগ ও ঘুষ খাওয়ার সুবিধা সম্বলিত পদে বদলি হওয়া বা পদে দীর্ঘদিন থাকার জন্য ঘুষ প্রদান, ভূমিদস্যুতা, সরকারি গাড়ির তেল চুরি করা, প্রকল্প কর্মকর্তা হয়ে দুইটি গাড়ি ব্যবহার করা, ওজনে কম দেওয়া, সুযোগ নিয়ে পণ্যের দাম বাড়ানো, নির্মাণকাজে যথাযথ ও মানসম্পন্ন কাঁচামালের ব্যবহার না করা, অফিস ফাঁকি দেওয়া—এমন হাজারো অনিয়ম, দুর্নীতি সম্পর্কে জনগণ অবহিত। বিদ্যুৎ, ওয়াসা, কাস্টম, আয়কর, ব্যাংক, জমি রেজিস্ট্রেশন, সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী আগেও ঘুষ খেত বলে এখনো খাবে—বর্তমান সরকারের এমন যুক্তিতে মানুষ বিরক্ত হয়। তার দিয়ে টাকা বেঁধে কারাগারের জানালার ক্ষুদ্রতম ছিদ্র দিয়ে জেলবন্দীকে টাকা দিতে দেখেছি বহু বছর পূর্বে, পাহারাদার পুলিশ বাধা দিতে চাইলে পাচারকারী পুলিশকে বলে যে, ‘এই টাকা তো আপনাদের জন্যই ভেতরে পাঠাচ্ছি’। পশ্চিম পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কায়ানি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘অপরাধ করার পর প্রায় সকল অভিযুক্ত আসামি দাড়ি-টুপি পরে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ায়’।
স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে। স্বাস্থ্যখাতের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা আগেও শোনা যেত এখনো শোনা যায়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রয়াত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও অনেক ডাক্তারকে প্রত্যন্ত এলাকায় রাখা যায়নি—এটাও নতুন কোন সমস্যা নয়। সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কর্মচারী ও দালালদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধে রোগীরা প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়—এই দুষ্টচক্র কোন সরকারই ভাঙতে পারেনি। চিকিৎসা সরঞ্জাম চালানোর দক্ষতা না থাকা সত্ত্বেও তা কেনার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, নতুন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার অল্প দিনের মধ্যে তা অকেজো করে দিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়ার অভিসন্ধি চাউর হয়েছে অনেক আগে, রোগীদের না দিয়ে ওষুধ চুরির ঘটনা সত্তর দশকে স্বচক্ষে দেখেছি, ওষুধ কোম্পানি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সাথে চিকিৎসকদের কমিশন চুক্তির ইতিহাস সকল স্বাস্থ্যমন্ত্রীই জানতেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কে দুর্নীতি দমন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হবে যে, এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি কোন সরকারের আমলেই নির্মূলের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ে একটি ইন্টারেস্টিং বিষয় পরিলক্ষিত হয়। যখনই কোন অপরাধ চিহ্নিত হয় তখনই প্রচার করা হয় যে, অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একজন দাগি আসামি, তার বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। আরেকটি আমোদজনক বিষয় হচ্ছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর দুর্নীতির রিপোর্ট সব দলীয় সরকারই বাস্তবতাবিবর্জিত আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় সরকারের সময় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিলো। পরকালের চিন্তা থেকেও অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না, ধর্মীয় মূল্যবোধের গুরুত্ব দুর্নীতিবাজদের কাছে অর্থহীন। ইন্দোনেশিয়ার মতো ঘুষের রশিদ প্রদানের রীতি প্রবর্তিত হলে জনগণ ঘুষ নিয়ে আর মাথা ঘামাবে না।
