তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল ছাড়াই প্রথম করোনা প্রতিষেধক আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার আবিষ্কৃত এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে কানাডা, আমেরিকা, ব্রিটেনসহ আরও কয়েকটি দেশ। রাশিয়ার প্রতিষেধকের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠায় পুতিন নিজের মেয়ের শরীরে সেই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে ভ্যাকসিনের প্রতি বিশ্ববাসীর আস্থা তৈরির প্রয়াস নিয়েছেন। বাজার দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকার জন্যই এমন তড়িঘড়ি করে ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু করায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও রাশিয়ার সমালোচনা করেছে। কারো প্রশ্নকে তোয়াক্কা না করে রাশিয়া সেপ্টেম্বর থেকে গণহারে ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু করবে; ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম এই ভ্যাকসিন পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এখনো নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০টি উদ্যোগের যে সাতটি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা গ্রহণযোগ্য হবে বলে ধারণা করা হয়েছিলো তার মধ্যে রাশিয়া ছিলো না, এই সাতটির মধ্যে আমেরিকার মডার্না, ইনোভিওর ভ্যাকসিনের অগ্রগতি ছিলো আশাব্যঞ্জক। ভ্যাকসিন উৎপাদনে একটি দিনেরও যাতে অপচয় না হয় সেজন্য পৃথিবীর শীর্ষ ধনী বিল গেটস ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগেই ওষুধ উৎপাদনের সাতটি কারখানা গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। পাঁচ বছর আগে বিল গেটস এই করোনা মহামারি সম্পর্কে বিশ্বকে সতর্ক করে বিশ্বনেতাদের সক্রিয় হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। ভালো কাজেও মন্দ উদ্দেশ্য আবিষ্কার করে মানুষ। তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হওয়ায় করোনাভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে তার ব্যবসায়িক হাত রয়েছে বলে কিছু আমেরিকান বিশ্বাস করেন।

ভ্যাকসিন নেয়ার পর বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হয় তৃতীয় ধাপে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার এই পর্যবেক্ষণ চলে দীর্ঘদিনব্যাপী। তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা না করায় রাশিয়ার ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে কি হবে না, হলে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানী নিশ্চিত হতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেকনোলজি কোম্পানি মডার্নার আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের দুটি ধাপের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় তৃতীয় ধাপের কাজ শুরু হয়েছে, এই ধাপের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ৩০ হাজার আমেরিকান স্বেচ্ছাসেবী। এই স্বেচ্ছাসেবীদের অর্ধেককে দেওয়া হচ্ছে সত্যিকার ভ্যাকসিন, আর বাকি অর্ধেকে দেওয়া হচ্ছে প্লাসেবো বা নিষ্ক্রিয় ওষুধ। এই দুই দলের কেউই জানবে না কাকে প্রকৃত ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। প্লাসেবো হচ্ছে এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি যা দিয়ে রোগী উপলব্ধি করে যে, তিনি যে ওষুধ খাচ্ছেন তা ধন্বন্তরি এবং গৃহীত ওষুধেই তার রোগ সেরে যাচ্ছে, অথচ কার্যকারিতাহীন ওষুধটির কোন প্রভাবই রোগের উপর ছিলো না। উভয় দলের স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে, বহুদিন ধরে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। উভয় গ্রুপ মাস্ক বা অন্য কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না নিয়েই করোনা-অধ্যুষিত এলাকায় যাতায়াত করবে, করোনা রোগীদের সংস্পর্শে আসবে। এর ফলে কোন গ্রুপের স্বেচ্ছাসেবক করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে তা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখা হবে। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা ওষুধ সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত ট্রায়াল ব্রাজিলে চলছে।

বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়া কিছু গ্রহণ করে না। কোন ভ্যাকসিন করোনাভাইরাস প্রতিষেধক হিসেবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হলেও গ্রহণযোগ্য হয় না, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়। কোন ভ্যাকসিনে ভাইরাস প্রতিরোধ হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, লিভার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, প্যারালাইসিস হতে পারে, গর্ভবতী মায়ের মৃত্যুও হতে পারে বা অন্য কোন রোগ; ভ্যাকসিন নেয়ার পরপর না হলেও কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর এমন কোন রোগ ভ্যাকসিন নেয়ার কারণে উদ্ভব হলে সেই ভ্যাকসিন গ্রহণযোগ্য হবে না। এই পরীক্ষা রাশিয়ার আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনে করা না হলেও রাশিয়া বলছে সামান্য জ্বর ছাড়া আর কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। প্রকৃতপক্ষে অচল পৃথিবীকে সচল করার জন্য ভ্যাকসিনের প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে।

মহান গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিসকে (৪৬০-৩৭৭ খ্রিস্টপূর্ব) চিকিৎসা

বিজ্ঞানের জনক বলা হয়ে থাকে। হিব্রুদের অবদান বাইজেন্টাইন যুগে শুরু হয়েছিল ইহুদি চিকিৎসক আসফের মাধ্যমে। বর্তমানে ৭৫০ কোটি মানুষের মধ্যে ইহুদির সংখ্যা মাত্র দেড় কোটি, অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাদের ঈর্ষণীয় অবদান রয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ প্রভাবশালী, কার্যকর, জনপ্রিয় বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও গবেষক ইহুদি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন ইহুদি। সাধারণত রোগ সংক্রমণ সংঘটক হচ্ছে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, প্রিয়ন। পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর চিকিৎসাক্ষেত্রে বিরাট বিপ্লব সাধিত হয়; যক্ষ্মা, সিফিলিসসহ ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া-সৃষ্ট যাবতীয় সংক্রমণ প্রতিরোধে অব্যর্থ ওষুধ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হচ্ছে; কিন্তু এই অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না।

বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গ্লোব-বায়োটেক ঘোষিত করোনার ভ্যাকসিন ল্যাবরেটরি অ্যানিমেল মডেলে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করে অ্যান্টিবডি তৈরিতে সন্তোষজনক ফলাফল পেয়েছে। তাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে। তবে গণস্বাস্থ্যের কিটের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্লোবের ভ্যাকসিন নিয়ে চিৎকার, চেঁচামেচি কম। গ্লোব পরিবারের একজন বর্তমানে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাংসদ। সম্ভবত তাই এখানে রাজনীতি কাজ করছে না। কোন কোন ভ্যাকসিন আবিষ্কারে বিশ/ত্রিশ বছর ব্যয় হয়েছে। রোগের ব্যাপক প্রকোপ না থাকলে কেউ এত ব্যয়বহুল ভ্যাকসিন আবিষ্কারে অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় না। এই কারণে অনেক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গবেষণা মাঝপথেই থেমে গেছে।

মানবজীবনের শুরুতে রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের একমাত্র পথ্য ছিলো ঝাড়ফুঁক আর গাছগাছড়ার লতা-পাতা। রোগ নিরাময় ও উপশমে মধু ও কালিজিরার কথা আমাদের নবী করিম (স.) বারবার বলে গেছেন, এখনো মানুষ রোগ নিরাময়ে এই দুইটি দ্রব্য ব্যবহার করে থাকে। মধ্যযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীদের হাতে চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিলো। মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে আর-রাজি কিডনি ও গলব্লাডারে কেন পাথর হয় সে বিষয়ে প্রথম মৌলিক তথ্য সম্বলিত বই লিখেছেন; তিনিই প্রথম হাম এবং গুটিবসন্তকে আলাদা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আবুল কাশিম আল জাহরাউয়িকে আধুনিক শল্যচিকিৎসার জনক বলে গণ্য করা হয়। ইবনে সিনা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক। উক্ত চিকিৎসকগণ ছাড়াও আলবেরুনি, ইবনে রুশদ, ইবনে নাফিস প্রমুখ বিখ্যাত চিকিৎসকের চিকিৎসাশাস্ত্র প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় পাঠ্য ছিলো। কিন্তু তারপর চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলমানদের আর কোন অবদান লক্ষ্য করা যায় না; এখন কিছু আলেম পৃথিবীর তাবৎ আবিষ্কারের উৎস কোরআন উল্লেখ করে তৃপ্তি পান, কিন্তু কোরআন গবেষণা করে তারা কিছুই আবিষ্কার করতে পারেন না। অধিকাংশ মৌলভী, মাওলানা, আলেম এখন ইহকালকে একেবারেই গুরুত্বহীন করে ফেলেছেন, চব্বিশ ঘণ্টা পরকাল, কবরের আজাব, মৃত্যুচিন্তা আর দোজখের আগুনের ভয়াবহতা প্রচার করায় মুসলমানেরা গবেষণাবিমুখ হয়ে প্রতিযোগিতাহীন নিষ্ক্রিয় জাতিতে পরিণত হয়েছে।