দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত আজকের (রবিবার, ৩১ মার্চ ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
একা এক নারী
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
২১ মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথের একটি মিসড কল দেখে ২৩ তারিখে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ফোন করেছিলি কেন?’ উত্তর এলো, ‘২৩ তারিখ সন্ধ্যা ৭টায় শিল্পকলা একাডেমিতে আমার নির্দেশনায় একটি নাটক মঞ্চস্থ হবে, ইচ্ছা হলে দেখতে পারিস।’ নাটক আমরা কম-বেশি সবাই দেখি। আমার আব্বা সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে, নাটক করতেন বিধায় সমাজচ্যুত হতে হয়েছে বহুবার। আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি করতেন বলে প্রায় প্রতি সপ্তাহে ভারতীয় দূতাবাসে কালজয়ী সিনেমাগুলো দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সত্তরের দশকে ডিশ ছিল না, তাই এখনকার মতো ঘরে বসে সব ছবি উপভোগ করা সম্ভব ছিল না। আমার মেজো ভাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রায়ই বেইলী রোডে মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক দেখতে যেতেন। এর আগে ১৯৬৪ বা ১৯৬৫ সালে আব্বা ফিলিপসের ‘পাই’ নামে একটি রেডিও কিনেছিলেন; আব্বা নিয়মিত আকাশবাণী কলকাতার নাটকগুলো শুনতেন, আমিও একপাশে বসে চুপ করে শুনতাম।
বিকেলে আমার এককালের বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকর্মী আশুতোষ, অসীম ও সুধীরসহ হলে গেলাম। হলে দেবনাথ ব্যস্ত ছিল বলে কথা বলিনি। সেখানে ম হামিদের পরিবারের অনেক সদস্যকে দেখলাম। এই পরিবারের সবাই সুপরিচিত—ম হামিদের এক ভাই কেএম খালিদ এখন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী, ম হামিদের আরেক ভাই মাহমুদ সাজ্জাদ একজন স্বনামধন্য মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ম হামিদের স্ত্রী ফাল্গুনী হামিদ সুপরিচিত অভিনেত্রী। ব্যাংকনোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভিডিও ক্লিপ তৈরির সময় ফাল্গুনী হামিদের সঙ্গে কয়েকবার দেখা হলেও এখন আর চিনতে পারবেন না। মন্ত্রী কেএম খালিদ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় সঙ্গত কারণেই তিনি নাটকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। নাট্যগোষ্ঠী ‘নাট্যচক্র’র সঙ্গে দেবনাথ সংশ্লিষ্ট, নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছে নাট্যচক্রের প্রযোজনায়; আর এ নাট্যচক্রের সভাপতি হচ্ছেন ম হামিদ এবং নাট্যচক্রের সঙ্গে জড়িত আছেন মাহমুদ সাজ্জাদ, ফাল্গুনী হামিদ ও তনিমা হামিদ। নাটকের উদ্বোধনে তাই এদের সবার উপস্থিতি প্রাসঙ্গিক। এই নাটকটি উদ্বোধন করেছেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ফেরদৌসি মজুমদার। সামনের সারিতে সারা যাকেরকেও দেখলাম; সারা যাকের ইতোপূর্বে দারিও ফো এবং ফ্রাঙ্কা রামে রচিত আরেকটি নাটক ‘ওপেন কাপল’র রূপান্তর ও নির্দেশনা দিয়ে নাটকের দুটি চরিত্রের একটিতে অভিনয় করেছেন। শিল্পকলা একাডেমির কফি হাউজের মালিক, অভিনেতা ও নির্দেশক শাহ আলমকে নাটকের পরিচিতি সংবলিত লিফলেট বিতরণ করতে দেখা গেল। তখনও জানি না, নাটকটির লেখক কে, কারা কারা অভিনয় করবেন ইত্যাদি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের তিনটি চেয়ারের একটিতে সভাপতি ম হামিদ, প্রধান অতিথি তার ছোট ভাই মন্ত্রী কেএম খালিদ এবং উদ্বোধক ফেরদৌসি মজুমদার, অনুষ্ঠান সঞ্চালক ফাল্গুনী হামিদ। মন্ত্রী তার বক্তব্যে তার ভাইঝি তনিমা হামিদের শিশু বয়সের সরলতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে উল্লেখ করলেন যে, তনিমা হামিদের কাছে তার বাবা ম হামিদ নাকি সব কিছুতেই সর্বশ্রেষ্ঠ—ফুটবল, হকি, বক্তৃতা, রাজনীতি সবকিছুতেই। তখন তার চাচা খালিদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর আব্বু চুরিতে কেমন?’ তনিমার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, ‘আমার আব্বু চুরিতেও শ্রেষ্ঠ’। মন্ত্রী মহোদয় দর্শকদের হাসি থামার পর বললেন, ‘কিছুদিন আগের এই সহজ-সরল ছোট্ট তনিমাই আজকের নাটকের একক অভিনেত্রী’। বুঝলাম এটি একটি একাঙ্কিকা এবং অভিনেত্রী তনিমা হামিদ।
নাটক শুরু হওয়ার আগে মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ডাকসুর সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে ‘অপরাজেয় বাংলার’ রূপকার ম হামিদ একটি কড়া সতর্কবাণী দর্শকদের উদ্দেশে উচ্চারণ করলেন। তিনি বললেন, ‘কেউ কথা বলবেন না, একটি শব্দও উচ্চারণ করবেন না, লাইট জ্বালিয়ে কেউ ছবি তুলবেন না; যদি কেউ এমন কিছু করেন তাহলে আমরা তাকে হল থেকে বের করে দিতে বাধ্য হবো।’ কোন অনুষ্ঠানে কথা বললে, লাইট জ্বালিয়ে ছবি তুললে পরিবেশ আর শান্ত থাকে না, অন্য দর্শক বিরক্ত হন, মঞ্চের অভিনেতা, অভিনেত্রীদের একাগ্রতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। এছাড়াও মনোযোগসহকারে বক্তৃতা না শুনলে বা নাটক না দেখলে বক্তা বা মঞ্চাভিনেতাদের প্রতি অবজ্ঞা ও অসম্মান করা হয়। আমি লক্ষ্য করি, প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বক্তার প্রতি মনোযোগ না দিয়ে কেউ পত্রিকা পড়ছেন, কেউ ফিসফিস করে কথা বলছেন, কেউ মোবাইল দেখছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। জাতীয় নির্বাহী কমিটি একনেকের বৈঠকেও এমন কিছু দৃশ্য দেখা যায়। এটা অগ্রহণযোগ্য। এরা অনুষ্ঠানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি; তাই এদের কাছ থেকে এমন বিসদৃশ আচরণ প্রত্যাশিত নয়। শিক্ষিত বাঙালিদের এমন একটি শিশুসুলভ আচরণ কেন এখনও রয়ে গেছে, সমাজবিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানী হলে এ নিয়ে আমি একটি বিশ্লেষণমূলক কলাম লিখতে পারতাম। এতদসত্ত্বেও ম হামিদের এমন কড়া ভাষা আমার পছন্দ হয়নি। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলে আমি তাকে আমার মনের অনুভূতিটি জানাতাম; শিল্পকলা একাডেমির মাঠে অনুষ্ঠিত পিঠা উৎসবে আমার বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক ঘনিষ্ঠ সহকর্মী জহির ও ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা জীবনদা ম হামিদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি জানি, বিখ্যাত ব্যক্তিরা কখনই স্বার্থসংশ্লিষ্ট না হলে একবার দুবারের পরিচয়ে কাউকে মনে রাখতে পারেন না। আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদের বাসার আঙিনায় অনুষ্ঠিত আমন্ত্রিত বিখ্যাত বিখ্যাত ব্যক্তিদের আতিথেয়তা করতে গিয়ে একাধিকবার পরিচিত হওয়ার পরও পরের অনুষ্ঠানে আবার নতুন করে বলতে হয়েছে, ‘আমি মহিউদ্দিনের ছোট ভাই’।
নাটক শুরু হলো; মঞ্চ আগে থেকেই সাজানো। অল্প কিছু দরকারি জিনিস দিয়ে পরিবারের একটি পরিপাটি বসতঘর তৈরি করা হয়েছে। তনিমা হামিদের নাটক বহুদিন দেখিনি; আজকাল ভারতীয় সিরিয়ালগুলোর দাপটে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো দেখা হয় না। অথচ এক সময় বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত নাটক ছিল জনপ্রিয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাটকের যে অগ্রগতি তা সাহিত্যের অন্য কোন শাখায় হয়নি। হুমায়ূন আহমেদ এসে নাটককে আরও দর্শকপ্রিয় করে তোলেন। আমি যে নাটকটি দেখতে এসেছি তার মূল নাম হচ্ছে, ‘A Woman Alone’, ইতালির নোবেল বিজয়ী নাট্যকার ও অভিনেতা দারিও ফো এবং তার স্ত্রী ফ্রাংকা রামে রচিত এ নাটকটির অনুবাদ করতে গিয়ে অধ্যাপক আবদুস সেলিম নাম দিয়েছেন ‘একা এক নারী’। নাটক দেখা শেষ হওয়ার পর অনুবাদক বলেন যে, তিনি অনুবাদ করতে গিয়ে দেশীয় আবহ ও সংলাপের সংযোজন করেছেন।
নাটকটিতে একক অভিনয় করতে গিয়ে তনিমা হামিদ দক্ষ অভিনেত্রীর পরিচয় দিয়েছেন। এই একাঙ্কিকাতে মঞ্চে তনিমা হামিদের আশপাশে কেউ নেই, নাটকের অদৃশ্য সব চরিত্রের অভিনয় তাকে একাই করতে হয়েছে। নাটক শুরু হওয়ার পূর্বে ফেরদৌসি মজুমদার ষাট ভাগ সফলতা কামনা করে তনিমার জন্য দোয়া করলেন, নাটক শেষ হওয়ার পর বললেন, তনিমা আশি ভাগ সফল। এত চুলচেরা বিশ্লেষণের ক্ষমতা আমার নেই; আমার কাছে মনে হয়েছে শতভাগ সফল। যৌনতা, পরকীয়া ইত্যাদি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে একটি কণ্ঠে অনেক চরিত্র ফুটিয়ে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। স্বামী, স্ত্রী দুজনই পরকীয়ায় মত্ত হলেও ঘরে তালা লাগানো থাকে শুধু স্ত্রীর ঘরে। ফ্ল্যাটে তালাবদ্ধ নিঃসঙ্গ নারী মারিয়া প্রতিদিনের গৃহস্থালি কাজের মধ্যে কাপড় ইস্ত্রি করার সময় প্রতিবেশী এক মহিলাকে দূর থেকে মহিলার ফ্ল্যাটে দেখেই কথা বলার ইচ্ছায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে। অদৃশ্য ওই মহিলার সঙ্গে মারিয়া তার জীবনে ঘটে যাওয়া ও ঘটমান সব ঘটনা বলতে বলতে নাটকের কাহিনীর অগ্রগতি হয়েছে। মাঝে মাঝে ল্যান্ডফোনে কল আসছে, ফোনে কথা বলতে গিয়ে যখন মারিয়া ক্ষেপে যায়, অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে তখন দর্শক বুঝতে পারে ফোনের এই কলগুলো মারিয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত; মারিয়ার বিপরীত ফ্ল্যাটের উৎসাহী তরুণ যখন গোপনে বাইনোকুলার দিয়ে মারিয়ার পোশাক বদলানো থেকে ঢিলেঢালা পোশাকে অবিন্যস্ত অবস্থাকে অবলোকন করে তখনও মারিয়া ক্ষেপে যায়, চিৎকার করে ওই লোকটির মুণ্ডুপাত করে। দুর্ঘটনায় সারা শরীর প্লাস্টার দ্বারা আবৃত থাকলেও মারিয়ার দেবর সুযোগ পেলেই প্লাস্টারবিহীন একটি হাত দ্বারা মারিয়াকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করেছে; কামাতুর এই দেবর কথা বলার শক্তি হারিয়ে একটি কলিং বেল দিয়ে ভাবি মারিয়াকে ডাকতো; কলিং বেলটি বেজে উঠলেই মারিয়া ক্ষেপে বকাবকি শুরু করে দিত। মারিয়ার আবার একটি ছোট বাচ্চা রয়েছে, মারিয়ার স্পর্শ পাওয়ার প্রত্যাশায় দেবর হুইলচেয়ারে করে ছোট শিশুটির ঘরে এসে মারিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, বাচ্চাকে শান্ত করতে বাচ্চার রুমে ঢুকতেই দেবরের হাত পড়ে মারিয়ার দেহে। স্বামীর সঙ্গে এক ষোড়শীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ষোড়শীর গর্ভবতী হওয়া ইত্যাদি কারণে নিঃসঙ্গ মারিয়া স্বামীর অনুমতি নিয়ে কমবয়সী এক যুবককে ইংরেজি শেখানোর জন্য নিয়োজিত করে। কিছুদিন গেলে যুবকের কথাবার্তায়, তাকানোর ভঙ্গিতে মারিয়ার সন্দেহ হলো যে, যুবক দিনদিন মারিয়ার প্রতি দুর্বল হয়ে উঠছে; মারিয়া ইংরেজি শেখা বন্ধ করে যুবককে বিদায় করে দিল। বাড়ি থেকে বিতাড়িত যুবক মারিয়ার চলাফেরার রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে লাগল, রাস্তার পাশের এক দেয়ালে ‘I love you Maria’ লেখা দেখে মারিয়া বুঝলো এই লেখা ওই যুবকের। ইতালির লোকেরা ইংরেজি জানে না বলে কেউ কিছু সন্দেহ করল না। মারিয়া তাকে এড়িয়ে চলাতে যুবকটি মারিয়ার কাছে ঘেঁষতে পারল না। বহুদিন যুবকের খোঁজ না থাকায় মারিয়া হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু একদিন যুবকের মা এসে মারিয়াকে অনুনয়-বিনয় করে তার মরতে বসা ছেলেকে বাঁচাতে অনুরোধ করল; মারিয়ার প্রেমে ছেলেটি শয্যাশায়ী, মারিয়া দেখা করলে হয়তো ছেলেটি জীবন ফিরে পাবে। স্বামীর অবহেলায় প্রেমবঞ্চিত মারিয়া তার ছেলের বয়সী একজন যুবকের এমন প্রেমের আবেগ দেখে কিছুটা পুলকিত হলো। সে দেখা করতে যুবকের বাড়িতে গিয়ে তার কক্ষে ঢুকলে যুবকের মা দরজা বন্ধ করে চলে গেল। তারপর যুবক তাকে জড়িয়ে ধরল, চুমু খেল এবং বিছানায় নিয়ে গেল। এভাবে যুবকের সঙ্গে পরকীয়া চলতে থাকলে মারিয়ার স্বামী যুবকের বাসায় গিয়ে দুজনকে একই বিছানায় দেখেও চিৎকার-চেঁচামেচি করেনি; কারণ বোধ হয় অন্য আরেকটি মেয়ের সঙ্গে তার বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক স্থাপনের দুর্বলতা। তবে স্বামী ওই দিন থেকে স্ত্রী মারিয়াকে তালাবদ্ধ ঘরে রেখে কাজে বের হতো। পরকীয়ায় মত্ত থেকেও মারিয়ার ওপর স্বামীর আধিপত্য, মারিয়ার যৌনবঞ্চনা, বাইনোকুলার হাতে বিপরীত ফ্ল্যাটের পরপুরুষের যৌন নিপীড়ন ও দেহ বিদ্ধ করা দৃষ্টি, ফোনে যৌন সংলাপের প্রত্যাশায় অদৃশ্য ব্যক্তির দুর্বৃত্তপনায় ফোনের উপর্যুপরি রিং টোনের আওয়াজ, মারিয়ার গৃহবন্দিত্ব, তালাবদ্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে ফোনে স্বামীর বারবার নেয়া খোঁজের ব্যঙ্গাত্মক উত্তর প্রদান, বদ্ধ দরজা খুলে প্রেমিক যুবকের ভেতরে প্রবেশের প্রচেষ্টা প্রতিহত করা, নাটকের শেষলগ্নে মারিয়ার দেহ স্পর্শের জন্য কামাতুর দেবরের আহ্বানের বীভৎস ঘণ্টাধ্বনির শ্লেষাত্মক উত্তর, ক্ষুধায় কাতর নিজ শিশুসন্তানের অবিরত কান্নায় ব্যাকুলতা, স্বামীর চাবি হারিয়ে ফেলার সংবাদ পেয়ে বদ্ধ ঘরে নিঃসঙ্গ মৃত্যুচিন্তা—সবকিছু সামাল দিয়ে মারিয়ারূপী তনিমা হামিদ অনবদ্য অভিনয় করে পুরো কাহিনীটি দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। বিভিন্ন অদৃশ্য চরিত্রের সঙ্গে কথা বলা ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় তনিমা হামিদ তার জীবনটাকে যেভাবে দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করেছেন তাতে আমি কোন ত্রুটি দেখিনি। একবার বোধ হয় সংলাপ ভুলে যাওয়ার জন্য একটু থেমে গিয়েছিলেন, তাও তিনি অন্য কাজে ব্যস্ততা দেখিয়ে কভার করতে পেরেছেন। এটা আমার বোঝার ভুলও হতে পারে; ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সেন্টারের জেনারেল সেক্রেটারি ও এই নাটকের নির্দেশক দেবপ্রসাদ দেবনাথ এটা ভালো বুঝবে এবং পরবর্তী প্রদর্শনীতে পরিশীলন করবে।
কিছুদিন আগে পরকীয়া নিয়ে আমি একটি কলাম লিখেছি। এই পরকীয়া অনেক কাল ধরে আমাদের সমাজে বিরাজমান হলেও লোকলজ্জায় অনুচ্চারিত। ক্রমবিবর্তনের ধারায় নাটকের বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন এসেছে, লোকলজ্জা আর অশ্লীলতার ভয়ে বিষয়বস্তুর এ পরিবর্তন জোর করে বাঁধ দিয়ে রোধ করা যাবে না; আরও পরিবর্তন অনিবার্য। অনুবাদক নাটকের শেষে মঞ্চে উঠে বলেছেন, আমাদের সমাজে এমন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থাকলেও তা দারিও ফো’র মতো খোলামেলা প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে তাকে মৌলিক গ্রন্থ রচনার পরিবর্তে অনুবাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে। এমন সম্পর্কের তথাকথিত অশ্লীল শব্দ উচ্চারণে প্রথমদিকে তনিমা হামিদের মধ্যে কিছুটা জড়তা ছিল, কিন্তু পরে তিনি সমস্ত জড়তা কাটিয়ে উঠেছেন। নাটকের প্রথম দিন বলেই সম্ভবত এমন হয়েছে। পরবর্তী শোগুলোতে পারফেকশান একশত ভাগ নিশ্চিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
নাটকের সব কিছু নির্দেশকের নির্দেশনায় চলে। নাটকের কোথাও সামান্য খুঁতের জন্যও নির্দেশককে দায়ী করা হয়। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের এককালের সেক্রেটারি জেনারেল দেবপ্রসাদ দেবনাথ এই মঞ্চনাটকের নির্দেশক হিসেবে মঞ্চসজ্জা, পোশাক-পরিচ্ছদ, আলোকসম্পাত, শব্দযোজনা, যথাযথ অভিনয় ও সংলাপ উপযোগী কৃত্রিম পরিবেশ বা আবহ তৈরি করে দর্শকদের কাছে সংঘটিত ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সমর্থ হয়েছে। সবার কাজগুলো সমন্বয় করতে হয়েছে তাকে। মূলত নির্দেশকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। বিষয়বস্তুর অনিবার্য প্রয়োজনীয়তায় এই নাটকে নির্দেশকের সৃজনশীল শিল্পরীতির প্রকাশ ঘটেছে। তনিমার অভিনয়ের মাধ্যমে বিষয়বস্তুকে হৃদয়গ্রাহী করতে পারাটাই নির্দেশকের কৃতিত্ব। নাট্যকারের লিখিত নাটককে সৃজনশীল প্রতিভা দিয়ে মঞ্চে রূপায়নের দায়িত্ব দেবনাথ সুচারুভাবে পালন করেছে। অভিনেত্রীর পোশাক নির্বাচন, একটি অঙ্কে কাহিনীর শুরু, বিস্তার ও পরিণতি টানার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তনিমাকে সঙ্গতিপূর্ণ করে উপস্থাপন করতে পেরেছে নির্দেশক দেবনাথ। তাই নাটক সফল হলে নির্দেশক সফল, চরিত্র ও সংলাপ দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারলে নির্দেশকের কৃতিত্ব। ১৯৮১ সালের ২৩ মার্চে আমি আর দেবনাথ বাংলাদেশ ব্যাংকে একসঙ্গে চাকরি করা আরম্ভ করি; প্রায় ৪০ বছর পর ২৩ মার্চ, ২০১৯ সালে তার নির্দেশনায় মঞ্চস্থ নাটক দেখে চাকরিজীবনের পাশাপাশি নাট্যজগতে তার চরম সফলতা দেখলাম। মঞ্চনাটকের একটি আলাদা আমেজ আছে—এখানে মাঠে খেলা দেখার মতো অভিনেতা, অভিনেত্রীদের সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে একাগ্রচিত্তে বিলীন হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। আমি বোদ্ধা নই বলে নাটকের চুলচেরা বিশ্লেষণ আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি নাটকটি উপভোগ করেছি। সুধীর এবং অসীম তাদের সুন্দরী বউদের নিয়ে নাটকটি দেখেছে, আমার বউ রেজিনা আহমেদকে নিয়ে নাটকটি আমার আবার দেখার আগ্রহ আছে।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com